ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) একাধিক বৈঠকে ব্যস্ত সময় পার করছে। ১১ দলীয় জোটে টানাপোড়েনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থান ও বক্তব্যকে ঘিরে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালেই দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জরুরি বৈঠকে বসে। একইসঙ্গে বিকেলে ১০ দলের লিঁয়াজো কমিটির সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের কথা রয়েছে।
জামায়াতের মগবাজার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হওয়া বৈঠকে উপস্থিত নেতারা জোটের ভবিষ্যৎ, আসন ভাগাভাগি এবং বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা মনে করছে, জোট ভেঙে গেলে নির্বাচনের ময়দানে আরও কোনঠাসা হয়ে পড়বে তারা। এই শঙ্কা থেকেই যেকোনো মূল্যে ঐক্য টিকিয়ে রাখতে চায় জামায়াত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনকে ছাড় দিয়ে হলেও দলে টেনে রাখার এই কৌশল জামায়াতকে আপাতত নির্বাচনী মাঠে বাঁচিয়ে রাখলেও, দীর্ঘমেয়াদে জোটে তাদের নিজস্ব আধিপত্য হারানোর আশঙ্কা প্রবল।
একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে জোটে রাখার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা চালানো হবে। তবে শেষ পর্যন্ত যদি এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ফাঁকা রাখা ৪৭টি আসনে জোট নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দেবে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১০ দলীয় জোট ২৫৩ আসনে সমঝোতার ঘোষণা দেয়। তখনও জানানো হয়েছিল, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান। অথচ পরদিন শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (Islami Andolan Bangladesh) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এককভাবে ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেন। বাকি ৩২ আসনে অন্য প্রার্থীদের সমর্থন জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়, ইসলামী আন্দোলন আর পুরনো জোটে ফিরে যাওয়ার পথে নেই। দলটির ভিন্নমতের পেছনে রয়েছে আদর্শগত অবস্থান। গাজী আতাউর রহমান বলেন, “প্রচলিত আইনে ৫৪ বছর রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, এই আইন ব্যর্থ। আমরা সব সময় বলে এসেছি ইসলামী আইনের প্রয়োগ চাই। যদি দেখি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আল্লাহর আইন নয়, প্রচলিত আইন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবেন, তাহলে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হবে না।” এই মন্তব্যে পরোক্ষভাবে জামায়াতকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তবে জামায়াত পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় এই বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। এক বিবৃতিতে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “গাজী আতাউর রহমান যেভাবে জামায়াতকে আল্লাহর আইন থেকে সরে আসা সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তা সঠিক নয়। এই বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। জামায়াত এখনও আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর আদর্শে পরিচালিত একটি সংগঠন।”
তিনি আরও বলেন, “খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের নেতার বরাত দিয়ে গাজী আতাউরের যে মন্তব্য সংবাদ সম্মেলনে এসেছে, তা সত্য নয়। আমরা ওই সময়ই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছি।”
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আদর্শগত মতপার্থক্যের পাশাপাশি নেতৃত্বের সংঘাত এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশলগত অসঙ্গতিই মূলত এই জোটে ফাটলের কারণ। ইসলামী আন্দোলনের প্রকাশ্য অবস্থান এবং জামায়াতের প্রতিক্রিয়া এটিই প্রমাণ করে যে, ঐক্য থাকলেও তার ভিত নড়বড়ে। আপাতত সময় কেনার কৌশল হলেও, ভবিষ্যতে এই জোট টিকিয়ে রাখা যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।


