পাবনায় অনুষ্ঠিত ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ছিল চড়া সুরে, চ্যালেঞ্জ ছোড়া, এবং পুরনো রাজনৈতিক ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার প্রয়াসে ভরা। তবে তাঁর বক্তৃতা যতটা আক্রমণাত্মক ছিল, তার তুলনায় অনেক প্রশ্ন থেকে যায় তার কথার বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
শনিবার রাতে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসভায় তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদের জোয়ার কেটে দিতে হবে। আমরা কারো রক্তচক্ষুকে ভয় করি না।” অথচ বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস, একাধিক দায়ী যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্ব, এবং বিচারবহির্ভূত অপকর্মের অভিযোগ তাকে এমন উচ্চস্থানে কথা বলার কতটা অধিকার দেয়—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ডা. শফিক দাবি করেন, “জামায়াতকে কেউ চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ বলে না।” এই বক্তব্য শোনার পর অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ অতীতে জামায়াতের রাজনীতির আড়ালে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতটা গভীরে গিয়েছিল—তা গোপন নয়। শফিকুর রহমান নিজেই স্বীকার করেন, তাদের বিরুদ্ধে আটটি মামলায় আসামি একজন করে। এর মানে, মামলা কম বলেই তারা নির্দোষ—এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
তিনি বলেন, “জায়গার নাম বললে গোস্যা করে।” অথচ রাজনীতিতে স্বচ্ছতা দাবি করা দলটি নিজেই অভিযোগ করে কিন্তু নির্দিষ্ট করে না, যা দায়িত্বশীলতার ঘাটতি বোঝায়।
জনসভায় তিনি জনগণকে আহ্বান জানান “৫৪ বছরের বস্তাপঁচা রাজনীতি” থেকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—জামায়াত কি নিজেই সেই পুরনো রাজনীতির ধারক নয়? সেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, এ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অতীত কতটা নতুনের প্রতীক?
“চাঁদা আমরা নেব না,” বলে দাবি করেন ডা. শফিক। হঠাৎ করে এই নির্দোষ চেহারা তুলে ধরার চেষ্টা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয় কি? তার বক্তব্যে থাকা “গরম ভাতে বি’\লাই বেজার হলে আমাদের কিছু করার নেই”–এর মতো কথাগুলো রাজনৈতিক শালীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়েছে, হজম করতে পারেনি, উগড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।” যদিও বাস্তবতা হলো—দলটি নিষিদ্ধ না হলেও আইনি সংকটে রয়েছে, এবং নির্বাচন কমিশনও তাদের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রতীক হারানোর পেছনে কারণ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র না, বরং সংগঠনটির অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান অবস্থান।
সবশেষে, তিনি যে “গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন” আনার ডাক দিলেন, তা জনগণের রাজনৈতিক বোধকে অবমূল্যায়ন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশে পরিবর্তনের ডাক নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই পরিবর্তনের দাবি যদি আসে একটি বিতর্কিত অতীতের দল থেকে, তা কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে?
এই সমাবেশে তিনি উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা সফর শেষে ঢাকায় ফেরার আগে গাজীপুরে পথসভায় বক্তব্য দেবেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এইসব উচ্চারণ, চড়া স্লোগান আর “গর্জে ওঠার” আহ্বান—এগুলো জনগণের জীবনের কোন বাস্তব পরিবর্তন আনবে?


