১৯৭৩ – ২০২৬: বাংলাদেশে কোন নির্বাচনে কত ভোট পড়েছিল?

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে কখন সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে আর কখন ভোটারের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে সামনে আসে দুটি ভিন্ন চিত্র। ভোটের হার যেমন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি নির্দেশক, তেমনি তা রাজনীতির স্বচ্ছতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনগণের আস্থার প্রতিফলনও বটে।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়েছিল সবচেয়ে কম ভোট, মাত্র ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে—৮০ দশমিক ২০ শতাংশ

সবচেয়ে কম ভোট: ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

এই নির্বাচনটি আয়োজিত হয়েছিল দলীয় সরকারের অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি উপেক্ষা করে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অধিকাংশ বিরোধী দল বয়কট করে।

ভোটার ছিল পাঁচ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮২ জন, আর ভোট পড়েছিল মাত্র ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। দেশজুড়ে ছিল ২১ হাজার ১০৬টি ভোটকেন্দ্র। বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও, মাত্র ১২ দিন পর আন্দোলনের মুখে সেই সংসদ বিলুপ্ত হয়। পরে ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় আরও একটি নির্বাচন।

সবচেয়ে বেশি ভোট: ২০১৮ সালের নির্বাচন

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল রেকর্ড পরিমাণে। মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন, এর মধ্যে ভোট দিয়েছিলেন আট কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১ জন। হার দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ।

এই নির্বাচনও বিতর্ক এড়াতে পারেনি। আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি থাকা, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, এবং কার’\চু’\পি–র অভিযোগ ছিল ব্যাপক। সেই কারণে এটিকে ‘রাতের ভোট’ নামেও অভিহিত করা হয়।

সুজনের তথ্যমতে, এই নির্বাচনে ১০৩টি সংসদীয় আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার নজির ছিল—যা আরও বিতর্ককে উসকে দেয়।

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার (বছর অনুযায়ী তালিকা)

১৯৭৩ প্রথম : ~৫৫% – স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন, আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়
১৯৭৯ দ্বিতীয়: ৪৯.৬৭% – বিএনপির উত্থান এবং প্রথমবার সংসদে প্রবেশ
১৯৮৬ তৃতীয়: ৪২.৩৪% – এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির উত্থান। বিএনপির বয়কট, জাতীয়পরির সাথে নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামীলীগ আর জামায়াত।
১৯৮৮ চতুর্থ : ৫৪.৯৩% – বড় দলগুলো বর্জন করে, জাতীয় পার্টির একতরফা জয়
১৯৯১ পঞ্চম : ~৫৫% – অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, খালেদা জিয়ার উত্থান।
১৯৯৬ (ফেঁরুয়ারি) : ষষ্ঠ – ২৬.৫৪% – সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতি, বিএনপি একতরফা জয়, মূলত সগবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের নির্বাচন।
১৯৯৬ (জুন) : সপ্তম – ৭৪.৯৬% – তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন – আওয়ামীলীগের পুনরুত্থান।
২০০১ : অষ্টম – ৭৫.৫৯% – বিএনপির সর্বশেষ জয়, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন |
২০০৮: নবম – ৮৭.১৩% – ১/১১ সরকারের অধীনে মোটামোটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামীলীগ।
২০১৪ : দশম – ৪০.০৪% (সরকারি মতে) – ভোট ছাড়াই বিজয়: ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় |
২০১৮ : একাদশ – ৮০.২০% – রাতের ভোটের নির্বাচন- সবচেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি |
২০২৪ : দ্বাদশ – ৪১.৮% (সরকারি মতে) – আমি-ডামির নির্বাচন, ভোটার বিহীন কেন্দ্রেও অর্ধের বেশি ভোট পড়ার ঘোষণা|

অংশগ্রহণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু ভোটারের উপস্থিতি দিয়ে নির্বাচনকে বিচার করা যায় না। বরং, রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ এবং জনগণের আস্থা আরও বড় বিষয়।

ভোটারের সংখ্যা অনেক হলেও, যদি সেই ভোট স্বতঃস্ফূর্ত না হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিফলন হয় না। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে একটি নির্বাচনকে অর্থবহ করে তুলতে। তাই এবার দেখার বিষয় এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি কেমন হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *