‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুসহ ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আজ শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক আনুষ্ঠানিক আয়োজনে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি (BNP)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman) ভার্চুয়ালি এই ইশতেহার পাঠ করেন। এতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুসহ ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি বলছে, এটি কেবল নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’র ঘোষণাপত্র।

নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি

  1. **‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। পর্যায়ক্রমে এই সহায়তা বাড়ানো হবে।

  2. ‘কৃষক কার্ড’ ও কৃষিতে প্রণোদনা: কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি, কৃষিবিমা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ফসলের বিপণন ব্যবস্থার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ সুযোগ পাবে মৎস্যচাষি, পশুপালক এবং কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও।

  3. মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা: জেলা ও মহানগরে উন্নত চিকিৎসাসেবা, মা-শিশুর পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যকর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

  4. শিক্ষাক্ষেত্রে রূপান্তর: কর্মমুখী, আনন্দময় ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমর্থন এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালুর ঘোষণা করা হয়েছে।

  5. তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান: কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্সে সংযুক্তি এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

  6. ক্রীড়াক্ষেত্রে বিস্তার: জেলা-উপজেলায় ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলে খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার পথে পরিণত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে।

  7. পরিবেশ ও জলবায়ু পদক্ষেপ: দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

  8. ধর্মীয় সম্প্রীতি ও কল্যাণ: সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ পরিকল্পনার ঘোষণা রয়েছে।

  9. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (যেমন পেপাল) চালু, আঞ্চলিক ই-কমার্স হাব প্রতিষ্ঠা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এসেছে।

দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান

ইশতেহারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিএনপি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানে থাকবে। ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি দমনই হবে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এজন্য পদ্ধতিগত ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি মনে করে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। তারা একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ দুদক গঠনের জন্য আইনি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছে।

ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, ২০০১ সালে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে, তখন বাংলাদেশ ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। দলটির দাবি, তাদের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিল এবং ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অতীতের পুনঃস্মরণ

বিএনপির ভাষ্যে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ শাসনের সময় বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামে পরিচিত হয়েছিল, যার থেকে উত্তরণ ঘটেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)–এর নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সময়ে।

‘প্রতিশোধ নয়, মানবিকতা’

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই হবে রাজনীতির মূলকেন্দ্র। ভয় নয়, অধিকার; লুটপাট নয়, উৎপাদন—এই দর্শনে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা জনগণের রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও বৈষম্যের অবসান হবে, এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *