সংবিধানের স্পষ্ট বিধান ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো কাঠামোর উল্লেখ নেই। ফলে এ ধরনের কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানো বা তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন সাংবিধানিক পদের শপথের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত আছে। সেখানে সংসদ সদস্যদের শপথের বিধান রয়েছে, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) এ ধরনের শপথ পড়ানোর এখতিয়ারও সংবিধানে নেই।
বিএনপির এই নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করা। সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ‘অ্যাভেইলেবল’ না থাকলে, অপারগ হলে কিংবা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকলে—দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন। সে হিসেবে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সিইসির শপথ পড়ানো সম্পূর্ণ সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে।
তবে এর বাইরে গিয়ে নতুন কোনো পরিষদ গঠন করে শপথের আয়োজন করতে হলে তা সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলে মত দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বক্তব্য, যদি সংবিধানে সংশোধন এনে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর ধারণা যুক্ত করা হয়, তৃতীয় তফসিলে শপথের ফরম নির্ধারণ করা হয় এবং কে শপথ পড়াবেন তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে—তাহলেই কেবল এ ধরনের উদ্যোগ বৈধতা পেতে পারে। এর আগে নয়।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এমন একটি পরিষদ গঠনের বিষয় উঠেছিল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। নিয়মিত সংসদ সেই মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও তারা প্রকাশ করে। এমনকি এভাবে সংশোধন হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।
কিন্তু বিএনপি শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দেয়, সংবিধানের বাইরে গিয়ে আলাদা কোনো পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্ভব—এটাই ছিল তাদের অবস্থান। দলটির মতে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন; সেই সংসদের মাধ্যমেই সাংবিধানিক সংশোধন আনা উচিত।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য দেখা দেয়। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল অধ্যাদেশের পরিবর্তে একটি ‘আদেশ’ জারির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিএনপি এর বিরোধিতা করে জানায়, রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন—আলাদা করে ‘আদেশ’ জারির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সংবিধানের সীমার বাইরে গিয়ে কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে তা জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলেই তারা মনে করে।
পরে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার পর গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ’ জারি করেন, যেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে বিএনপির দৃষ্টিতে, যে কোনো উদ্যোগই হতে হবে সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের প্রধান নির্বাহী ও সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার (Badiul Alam Majumdar) বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে অনেক বিষয় সরাসরি উল্লেখ নেই। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসনের পর দেশ যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পথে, তখন বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে উদারতা ও সমঝোতার মনোভাব দেখানো।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের ওপর সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব আরও বেড়েছে। সে কারণেই দলটি সংবিধানের সীমারেখা মেনেই এগোতে চায়—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা অটুট থাকে।


