স্বাধীনতার পর প্রথমবার নোয়াখালী মন্ত্রিসভায় পেল না কোনো প্রতিনিধি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী জেলা এর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয়লাভ করেছে বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party)। তারপরও নতুন মন্ত্রিসভায় জেলার কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিজয়ের উচ্ছ্বাস ম্লান করে দিয়েছে মন্ত্রিসভার তালিকা প্রকাশের পরের বাস্তবতা। স্থানীয় নেতা-কর্মী থেকে সাধারণ সমর্থক পর্যন্ত অনেকেই বিষয়টিকে কেবল পদবঞ্চনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়নের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোয়াখালী ইস্যুটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। দলীয় কর্মীদের পোস্ট, সমর্থকদের মন্তব্য এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়—জেলার মানুষ আশা করেছিলেন অন্তত একজন নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন।

ঐতিহাসিকভাবে নোয়াখালী বিএনপির জন্য শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালের পর একতরফা নির্বাচনের সময়গুলো বাদ দিলে জেলার অধিকাংশ আসনই দলের দখলে ছিল। এমনকি ২০০৮ সালের বিপর্যয়ের নির্বাচনে সারা দেশে হার সত্ত্বেও নোয়াখালী থেকে চারটি আসনে জয় আসে। এবারের নির্বাচনে পাঁচটি আসনে বিজয় সেই ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—দলের কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে কেউ না কেউ রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব পাবেন।

নির্বাচনে জয়ী নেতাদের অভিজ্ঞতা নোয়াখালীকে পিছনে রাখেনি। নোয়াখালী-২ আসনের জয়নুল আবদিন ফারুক ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বরকতউল্লা বুলু ও মো. শাহজাহান পাঁচবার সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন দ্বিতীয়বার এবং মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাদের নাম স্থানীয় আলোচনায় ছিল।

স্বাধীনতার পর প্রায় প্রতিটি সরকারেই নোয়াখালীর প্রতিনিধিত্ব মন্ত্রিসভায় ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলেছেন, যা জেলার রাজনীতিকে জাতীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থানে বসিয়েছে। সেই ইতিহাস থেকেই এবারও এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

তৃণমূলের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছে আবেগ ও বাস্তবতার মিশ্র সুর। জেলা সদরের ক্রীড়া সংগঠক মো. জহীর উদ্দিন মনে করেন, পাঁচটি আসনে ধানের শীষের বিজয় নোয়াখালীর পরীক্ষিত নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাই মন্ত্রিসভায় অন্তত একজন অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাশিত ছিল। ব্যবসায়ী আশরাফুল এজাজ নতুন মন্ত্রিসভায় নবীন–প্রবীণের সমন্বয়কে ইতিবাচক বললেও জেলার অনুপস্থিতিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খান লিখেছেন, দলকে ধারাবাহিকভাবে আসন উপহার দেওয়ার পরও জেলা বঞ্চিত হয়েছে। প্রবাসী সাংবাদিক সাহেদ শফিক আন্দোলনের সময়কার ত্যাগ তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠনের সময় আঞ্চলিক ভারসাম্য, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা—all মিলিয়ে সমন্বিত হিসাব করা হয়। তাই কোনো জেলার শক্ত নির্বাচনী ফলাফল থাকলেও সরাসরি মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। তবু নোয়াখালীর মতো ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ায় রাজনৈতিক বার্তা কী গেল—সেই প্রশ্ন উঠছে।

স্থানীয় উন্নয়নও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। গণঅধিকার পরিষদ-এর নেতা আব্দুজ জাহের মনে করেন, নোয়াখালী বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও বিমানবন্দরসহ বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। তার মতে, বর্ধিত মন্ত্রিসভায় এই শূন্যতা পূরণ হতে পারে।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীরের বক্তব্যে তৃণমূলের অনুভূতি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তবে প্রকাশ্যে ক্ষোভ থাকলেও দলীয় শৃঙ্খলার কারণে কেউই বিষয়টিকে সংঘাতমুখী করতে চান না।

পরিস্থিতি একপাক্ষিক হতাশার নয়। অনেকেই মনে করছেন, প্রথম দফার মন্ত্রিসভা ঘোষণায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণে নোয়াখালীর প্রতিনিধিত্ব আসতে পারে। নতুন সরকার দক্ষতা ও কার্যকারিতার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করতে পারলে আঞ্চলিক বঞ্চনার আলোচনা ধীরে ধীরে প্রশমিত হবে বলেও তারা বিশ্বাস করেন।

স্বাধীনতার পর প্রথমবার মন্ত্রিসভায় নোয়াখালীর কোনো প্রতিনিধি না থাকায় জেলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন প্রশ্ন এসেছে—দলীয় অবদান, নির্বাচনী সাফল্য ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্বের সমীকরণ কীভাবে নির্ধারিত হবে। সেই উত্তর মিলবে হয় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে, নয়তো সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে জেলার বাস্তব উন্নয়নের প্রতিফলনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *