খলিলুর রহমানের নাম বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে—এমন সব সন্ধিক্ষণে, যা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। নীরব, কিন্তু প্রভাবশালী উপস্থিতি—এই দুই শব্দেই যেন তার দীর্ঘ পথচলার সারাংশ ধরা পড়ে।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব ছিলেন। সেই নির্বাচনেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party) বড় ব্যবধানে জয় পায়। ওই সময় থেকেই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রকাশ্য রাজনীতির আলোয় খুব বেশি না এলেও, ভেতরের সমন্বয় ও যোগাযোগে তিনি ছিলেন সক্রিয়—এমন ধারণা দলীয় অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত।
দুই দশক পর, মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus) নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় আবারও সামনে আসেন তিনি। গত বছর বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক যখন তলানিতে ঠেকে, তখন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন খলিলুর। সেই বৈঠকেই প্রথমবারের মতো স্পষ্ট নির্বাচনী সময়সূচির ঘোষণা আসে। বৈঠকের আগেই তিনি আলাদাভাবে তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সঙ্গে কথা বলে ভুল বোঝাবুঝি কমানোর উদ্যোগ নেন বলে জানা যায়। কূটনৈতিক নীরবতা বজায় রেখেও তিনি রাজনৈতিক সেতুবন্ধনের কাজটি করেছিলেন।
ইউনূস সরকারের ভেতরে খলিলুর ছিলেন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সক্রিয়তার জন্য পরিচিত। রোহিঙ্গা সংকটের উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেলেও তিনি শুধু মানবিক সহায়তার প্রশ্নে থেমে থাকেননি। ভারতের দিক থেকে আসা বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন—ফ্যাক্ট-চেকার ও সাংবাদিকদের নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাবও দেন। যদিও সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তার সক্রিয় ভূমিকা অনেক সময় পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের অবস্থানকে ছাপিয়ে গেছে—এমন মন্তব্যও শোনা গেছে নীতিনির্ধারণী মহলে। যেখানে তৌহিদ হোসেনকে তুলনামূলক সতর্ক ও সংযত ভূমিকায় দেখা গেছে, সেখানে খলিলুর গড়ে তোলেন দ্রুত যোগাযোগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক—মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত।
ওয়াশিংটন সফরে তিনি হোয়াইট হাউসে ইলন মাস্কের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে স্টারলিংকের অনুমোদন দ্রুত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকার কথাও উঠে আসে। ধারণা করা হয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরিতে তার পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
ইউনূস সরকারের শেষ পর্যায়েও যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাণিজ্য আলোচনার যৌথ বিবৃতিতে শেষ মুহূর্তে একটি বাক্য যুক্ত করার প্রসঙ্গে তার নাম সামনে আসে—যেখানে গাজায় সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা বিবেচনার কথা উল্লেখ ছিল। দেশে এ নিয়ে সমালোচনা হয়, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সেটি কার্যকর ভূমিকা রাখে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
একই বাণিজ্য আলোচনায় তার আরেকটি সাফল্য ছিল মার্কিন তুলা ব্যবহারের ধারা নিশ্চিত করা। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পায়। অনেক রপ্তানিকারক নীরবে বিষয়টি স্বাগত জানান। অন্যদিকে, একই খাতে প্রতিযোগী ভারত এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে যায়।
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে খলিলুর গত এপ্রিলে জাতিসংঘ (United Nations)-এর মহাসচিবকে ঢাকায় আনার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার দৃঢ় অবস্থান সামরিক মহলের একটি অংশের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। তিনি রাখাইনে প্রভাবশালী আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি ভিডিও আলোচনার উদ্যোগ নেন, যাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও এগোয়।
পরে ব্যাংককে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি প্রকাশ্যে “রোহিঙ্গা” শব্দটি ব্যবহারের দাবি তোলেন—যা মিয়ানমার দীর্ঘদিন এড়িয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সেই দাবি মেনে নেওয়া হয়।
একই সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খুলে দেন তিনি এবং পরবর্তী সফরেও বৈঠক করেন। এমনকি তার সঙ্গে এমন একজন সহযোগী ছিলেন, যার নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি—যা ইঙ্গিত দেয়, প্রয়োজন হলে তিনি প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়েও কাজ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, রোহিঙ্গা দূত এবং রাজনৈতিক দূতের দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। মূলত জামায়াতের বিরোধিতার কারণেই বিষয়টি থেমে যায় বলে জানা যায়। এই ঘটনাই তাকে বিএনপির কাছে আরও বেশি আস্থাভাজন করে তোলে।
একসময় যে বিএনপি তার বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে পদত্যাগ দাবি করেছিল, একসময় যাকে ঘিরে দলীয় মহলে সংশয়, সমালোচনা ও নানা বিতর্ক ছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই দলই এখন তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত পুনর্বাসনের গল্প নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত বহন করে।
তবে সমালোচনা থেমে নেই। সামরিক মহলের একটি অংশ তাকে নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাকে পদোন্নতি দিয়ে ধরে রাখার মাধ্যমে তারেক রহমান হয়তো নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি কৌশল নির্ধারণে নিজের স্বাধীন অবস্থানও তুলে ধরছেন। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত—কিন্তু বিতর্কের রেখা স্পষ্ট। সময়ই বলে দেবে, এই আস্থার রাজনীতি কতটা ফলপ্রসূ হয়।
ফেসবুকে সাংবাদিক নাজমুল আহসানের পোস্ট থেকে সংকলিত


