সিলেটের রাজনীতিতে একটি প্রবাদ বহুদিন ধরেই ঘুরে বেড়ায়—‘আরিফ মানেই চমক’। ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে যাত্রা শুরু, পরপর দুই মেয়াদে সফল মেয়র, আর এখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আরিফুল হক চৌধুরী নিজেকে কেবল দলীয় নেতা হিসেবে নয়, বরং আধুনিক সিলেটের অন্যতম রূপকার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে নিজের রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া আরিফুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক চেতনার সূচনা ছাত্রজীবনেই। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman) সিলেট সফরে এলে তরুণ ছাত্রনেতা আরিফুল সাহসিকতার এক নজির গড়েন। কয়েকজন সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দাবি জানান একটি খেলার মাঠের। কড়া নিরাপত্তার বলয়ে এমন দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। নিরাপত্তাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হলেও জিয়াউর রহমান গাড়ি থামিয়ে নেমে আসেন। তরুণের দাবি শুনে তিনি মুগ্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন সমস্যার সমাধানে। বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই যেন রাজনীতির ময়দানে আরিফুলের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি।
১৯৭৯ সালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তৃণমূল থেকে উঠে এসে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের বড় বাঁক।
তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান (M Saifur Rahman)-এর আস্থাভাজন হিসেবে তিনি নগর উন্নয়নে নিজেকে উজাড় করে দেন। কাউন্সিলর থাকাকালেই পান নগর উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। তার উদ্যোগে একাধিক সড়ক প্রশস্ত হয়। নগরবাসীর সহযোগিতায় অনেকে স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দেন উন্নয়নের স্বার্থে।
২০১৩ সালের সিলেট সিটি করপোরেশন (Sylhet City Corporation) নির্বাচন ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমে তিনি ‘অপরাজেয়’ খ্যাত প্রয়াত নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরান (Badr Uddin Ahmed Kamran)-কে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সিলেটের ‘নগর পিতা’ নির্বাচিত হন। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ক্ষোভ তার পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলে। নির্বাচনের পর গভীর রাতেও তাকে নগর পরিচ্ছন্নতার কাজে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। রাস্তা প্রশস্তকরণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অবৈধ দখলে থাকা খাল উদ্ধার করে তিনি দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া (Shah AMS Kibria) হ’\ত্যা মামলায় তার নাম জড়ানো দীর্ঘদিন তাকে চাপের মুখে রাখে। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে গ্রেনেড হা’\মলায় নি’\হত হন কিবরিয়া। পরবর্তী তদন্ত ও চার্জশিটে ২০১৪ সালে আরিফুল হক চৌধুরীকে অভিযুক্ত করা হলে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। জামিন নামঞ্জুর হয়ে কারাগারে যেতে হয় তাকে। সাময়িকভাবে বরখাস্তও হন মেয়র পদ থেকে। ২০১৬ সালের শেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে ২০১৭ সালের শুরুতে তিনি পুনরায় দায়িত্বে ফেরেন।
২০১৮ সালের সিসিক নির্বাচন ছিল আরও নাটকীয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পাশাপাশি নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গেও তাকে লড়তে হয়। ১৩৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টির ফল ঘোষণার পর তিনি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও দুই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত থাকায় সেদিন রাতে ফল ঘোষণা সম্ভব হয়নি। পরে পুনরায় ভোটে তিনি চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়ে প্রায় ৬ হাজার ১৯৬ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন।
২০২৩ সালের সিটি নির্বাচনে সম্ভাব্য জয় নিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী না হয়ে তিনি ত্যাগের নজির স্থাপন করেন। পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন পেয়ে মাত্র ২০ দিনের প্রচারণায় দলকে ঐক্যবদ্ধ করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন মাঠে থাকলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আস্থায় ভোটাররা তাকে গ্রহণ করেন। নির্বাচনে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি প্রমাণ করেন—রাজনীতির ময়দানে তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর।
কাউন্সিলর থেকে মেয়র, মেয়র থেকে সংসদ সদস্য—এ পর্যন্ত জীবনের কোনো নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ পাননি আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেটের রাজনীতিতে তাই এখনও উচ্চারিত হয় সেই প্রবাদ—আরিফ মানেই চমক।


