বিদেশে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammad Shahabuddin)। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রপতির অংশগ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এলেও তখনকার সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা তাঁর বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়ান।
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবন (Bangabhaban)-এ গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি জানান, অন্তত দুটি দেশের আমন্ত্রণের বিষয়ে তিনি নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছিলেন। এর একটি ছিল কসোভো (Kosovo)।
গত ডিসেম্বরে কসোভোতে আয়োজিত একটি অ্যাসেম্বলিতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে ‘কি-নোট পেপার’ উপস্থাপনের জন্য তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে সেই সফরে তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “আমন্ত্রণ ছিল, প্রস্তুতিও ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না।”
এরপর আসে আরেকটি আমন্ত্রণ—কাতার (Qatar)-এর আমিরের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশগ্রহণের আহ্বান। সেখানে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল এবং প্রটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ছাড়া অন্য কারও অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Foreign Affairs) থেকে তাঁকে একটি চিঠি পাঠানো হয়, যার খসড়া তারাই তৈরি করে দেয়। চিঠির ভাষায় উল্লেখ ছিল—রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি ওই সামিটে অংশ নিতে পারছেন না এবং এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন। শুধু তাই নয়, সেই খসড়া চিঠিতে সই করার জন্য তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং একই সঙ্গে কাতারের আমন্ত্রণপত্রের কপিও পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের আগে তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। বরং চিঠি হাতে পাওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন, কাতার থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এসেছিল এবং তার জবাব হিসেবেই আগেভাগে প্রত্যাখ্যানপত্র তৈরি করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানের আলোকে একজন রাষ্ট্রপতি কি আদৌ এমনভাবে ‘রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে’ এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সামিটে অংশ নিতে পারবেন না? তাঁর মতে, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারেরও প্রশ্ন।
পরিস্থিতি বুঝে তিনি খসড়া চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন যুক্ত করে পাল্টা চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান। সেই চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের আচরণকে তিনি শিষ্টাচারবহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আখ্যা দেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ না নিতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সতর্ক করেন। তবে ওই চিঠির কোনো জবাব তিনি পাননি বলেও জানান রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, এরপর আর কোনো দেশ থেকে তাঁর জন্য আমন্ত্রণ এসেছিল কি না, সে বিষয়ে জানার সুযোগও তাঁর হয়নি। তাঁর ধারণা, তাঁকে বিদেশ সফরে যেতে না দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর নাম ও পরিচয়কে আড়াল করে রাখা। “ওই সরকার চায়নি কোথাও রাষ্ট্রপতির নাম উচ্চারিত হোক বা জনগণ তাঁকে চিনুক”—এমন মন্তব্য করে তিনি জানান, এই মানসিকতা তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে।
শুধু বিদেশ সফর নয়, দেশের ভেতরেও তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় রেওয়াজ হলেও সেটিও আটকে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, এটি শুধু ব্যক্তিগত অবমাননা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রথা ও মর্যাদার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।


