ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনের ধ্বংসাবশেষকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর আবাসন প্রশ্নটি সামনে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা (Jamuna)-কেই বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। নিরাপত্তা ও সচিবালয়ে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় রাজধানীর হেয়ার রোডের এই স্থাপনাকেই তাঁর সরকারি বাসভবন হিসেবে নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী গুলশানে নিজস্ব বাসভবনে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তিনি আবদুল গণি রোডের সচিবালয় এবং তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তবে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতায় যমুনায় স্থানান্তরকে অধিক কার্যকর বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
এই মুহূর্তে যমুনায় অবস্থান করছেন সদ্যবিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি আবাসন পরিদফতর জানিয়েছে, তিনি আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি যমুনা ছেড়ে দেবেন।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) গণপূর্ত অধিদফতর (Public Works Department)-এর প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী যমুনায় থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা চলতি মাসেই বাসা ছাড়বেন। এরপর প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ হলেই প্রধানমন্ত্রী সেখানে উঠবেন।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন রমজানে ইফতার অনুষ্ঠান এবং ঈদুল ফিতরে অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় অনুষ্ঠান যমুনায় আয়োজনের ইচ্ছা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দ্রুত সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
৩০ হেয়ার রোডে অবস্থিত যমুনার আয়তন প্রায় সোয়া তিন একর। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যমুনার পাশের ২৪ ও ২৫ নম্বর বাংলোবাড়িতে বর্তমানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবস্থান করছেন। ইউনূস যমুনা ত্যাগ করলে এই দুটি বাংলোবাড়ি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
এদিকে সরকারি আবাসন পরিদফতর (Government Housing Directorate) জানিয়েছে, বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বাসা বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বরাদ্দ পেলেও বাসায় উঠতে কিছুটা সময় লাগবে। বেশ কিছু বাসায় সংস্কার প্রয়োজন। ঈদুল ফিতরের পর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নির্ধারিত বাসভবনে উঠতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
হেয়ার রোড, মিন্টো রোড ও বেইলি রোড এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ‘মন্ত্রিপাড়া’ নামে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও এই এলাকাতেই বসবাস শুরু করেছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সদ্যবিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ধীরে ধীরে বাংলোবাড়ি ছেড়ে দিচ্ছেন। সরকারি আবাসন পরিদফতর জানিয়েছে, বেশির ভাগ উপদেষ্টা ইতোমধ্যে বাসা ছেড়েছেন। সর্বশেষ সোমবার তিনজন সাবেক উপদেষ্টা বাংলোবাড়ি ত্যাগ করেন। আরও দুজন শিগগিরই ছাড়বেন বলে জানিয়েছেন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগেই মিন্টো রোডের ৩৩ নম্বর বাংলোবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তিনি ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। পরে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি (BNP)। ফলে তিনি একই বাসভবনেই থাকছেন।
কে কোথায় বরাদ্দ পেলেন
সরকারি আবাসন পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ৩৫ হেয়ার রোড, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ২৪ বেইলি রোড, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)-কে ৫ হেয়ার রোড, সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনকে ২৫ বেইলি রোড, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে ৭ মিন্টো রোড, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুকে ২ মিন্টো রোড, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে ৫ মিন্টো রোড, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে ১ হেয়ার রোড এবং পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে ৬ হেয়ার রোডের বাংলোবাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে ১ মিন্টো রোড, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে ৪ মিন্টো রোড, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ৩৪ মিন্টো রোড, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামকে ৪১ মিন্টো রোড এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে ২ হেয়ার রোডে বাংলোবাড়ি দেওয়া হয়েছে।
মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খানকে বেইলি রোডে বাংলোবাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে গুলশানে, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে গুলশানে এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ধানমন্ডিতে সরকারি বাসা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীদের জন্য হেয়ার রোডের মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে তিনটি দশতলা ভবনে মোট ৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে—প্রতিটি ভবনে ১০টি করে। নতুন সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো গুছিয়ে নিতে এই আবাসন পুনর্বিন্যাসকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


