বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের বোঝা চাপানোর চেয়ে লোডশেডিংয়ের সাময়িক কষ্ট মেনে নেওয়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত—এমন মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (Iqbal Hasan Mahmud Tuku)। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে জ্বালানি খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (Forum for Energy Reporters of Bangladesh – FERB)-এর নবনির্বাচিত কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিগত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP) সরকার (২০০১-২০০৬) লোডশেডিং রেখে গেলেও জনগণের ওপর ঋণের পাহাড় চাপিয়ে দেয়নি। বর্তমানে বাতি জ্বললেও জাতি ঋণের জালে নিমজ্জিত। ঋণের এই দায়ভার বহন করার চেয়ে কিছুটা কষ্ট করে থাকা অনেক ভালো।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে তিনি তাৎক্ষণিক স্বস্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বসিয়ে রাখা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। উৎপাদন না হলেও চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যয় বেড়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক চাপে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, বিশাল ঋণের বোঝা থাকা সত্ত্বেও এখনই সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ দিতে চান না তিনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund – IMF) দাম বাড়ানোর বিষয়ে চাপ দেওয়ার আগেই সরকার ব্যয় কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সিস্টেম লস কমানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির সময়ে যেখানে সিস্টেম লস ছিল ৬ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘমেয়াদে এই লস ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী সাবেক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (Bangladesh Awami League) সরকারকে দায়ী করেন। তার দাবি, দীর্ঘ সময় নতুন কূপ খনন না করা এবং উৎপাদন না বাড়ানোর কারণে বর্তমান এই ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবস্থাপনার ত্রুটির চেয়ে গ্যাসের ঘাটতিকেই তিনি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার বক্তব্য, ‘চাইলেই রাতারাতি গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়, এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন।’
সামগ্রিকভাবে মন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—তাৎক্ষণিক স্বস্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্য ও কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চায় সরকার, যদিও সেই পথে কিছুটা কষ্ট মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে দেশবাসীকেই।


