রাজনৈতিক দল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করলো জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party) বা এনসিপি। নানা সীমাবদ্ধতা, সাংগঠনিক ঘাটতি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত এক বছরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আপসহীন অবস্থানে থাকার দাবি করেছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam)। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি নতুন এই দল।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অস্থির ও রক্তক্ষয়ী সময়। রাজপথে টানা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের ফ্যাসীবাদী শাসনের। সেই অগ্নিঝরা সময়ের ছয় মাসের মাথায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি, গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা ছাত্র সমন্বয়কদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার অঙ্গীকার আর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে দলটি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে এনসিপির রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, গণহ’\ত্যা’\র বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। দলটির নেতারা বারবার বলেছেন, কেবল ক্ষমতার অংশীদার হওয়া নয়—রাষ্ট্র কাঠামোয় জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। দ্বিতীয় বছরে পা রেখে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়ও পুনর্ব্যক্ত করেছেন নেতারা।
দল গঠনের এক বছরের মধ্যেই জোটবদ্ধভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় এনসিপি। ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ছয়টিতে জয়লাভ করে দলটির মনোনীত প্রার্থীরা। নতুন দল হিসেবে এটিকে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার ভাষ্য, সীমিত সময় ও সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেও জনগণের আস্থা অর্জনের সূচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে।
তবে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে বিশ্লেষকদের কাছ থেকে। তাদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে শূন্যতা ও নতুন নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হয়েছিল, সেখানে শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুবর্ণ সুযোগ ছিল এনসিপির সামনে। নির্বাচনে আংশিক সাফল্য পেলেও সাংগঠনিক বিস্তার, গ্রামীণ জনভিত্তি এবং স্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপনে দলটি প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল হয়নি বলেই মনে করছেন তারা।
দ্বিতীয় বছরে যাত্রা শুরুর এই মুহূর্তে তাই এনসিপির সামনে দ্বৈত বাস্তবতা—একদিকে অর্জনের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে সম্ভাবনাকে পূর্ণতায় রূপ দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান।


