বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা স্পর্শকাতর বহু অধ্যাদেশ ঘিরে এখন প্রশ্নের মুখে নবগঠিত বিএনপি সরকার। বিশেষ করে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বহাল রেখে সেটিকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি রয়েছে তাদের। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—কোনগুলো টিকে থাকবে, আর কোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মৃত’ হয়ে যাবে?
আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, আঠারো মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক (Shahdeen Malik) হিসাব কষে বলছেন, এত অল্প সময়ে এতগুলো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার অর্থ গড়ে পাঁচ দিনেরও কম সময়ে একটি করে অধ্যাদেশ। নতুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে ১২ মার্চ। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ আইনি ভিত্তি পাবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অধ্যাদেশগুলো তারা যাচাই-বাছাই করছে। তবে কোনগুলো আইনে পরিণত হবে, আর কোনগুলো হবে না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আপত্তি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ (Awami League) সরকারের পতনের তিনদিন পর গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party), জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami)সহ সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন দিয়েছিল। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশ জারির সময় থেকেই আপত্তি তোলে বিএনপি। দলটি প্রশ্ন তোলে—এ ধরনের আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার আদৌ ছিল কি না।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করেও বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিএনপি ও তাদের মিত্রদের ২১২ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও জামায়াত ও এনসিপি জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন।
আইনজ্ঞদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণভোট হয়েছে এবং সেখানে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে শাহদীন মালিকের বক্তব্য, অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের কোনো অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। তার ভাষায়, “সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অধ্যাদেশের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে।”
দায়মুক্তি অধ্যাদেশে সমর্থনের ইঙ্গিত
সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬। ২৫ জানুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে এটি জারি হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং ভবিষ্যতে নতুন মামলা দায়ের আইনত বাধাগ্রস্ত হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি ছিল—গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হ’\ত্যাকাণ্ডসহ নানা ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে দায়মুক্তি দেওয়া সংবিধান পরিপন্থি হতে পারে। যদিও এতে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তরা চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন।
তবে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এই অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে তাদের। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেকে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন, ১৪০০ প্রাণহানি ও বহু আহতের ঘটনা ঘটেছে—এখানে আবেগ-অনুভূতির বিষয়ও রয়েছে। ফলে বিএনপি এ অধ্যাদেশের বিপক্ষে যাবে না বলেই ইঙ্গিত মিলছে। জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্য দলগুলোর অবস্থানও এর পক্ষে।
তবে সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের হ’\ত্যার ঘটনা আলাদাভাবে তদন্তের চিন্তাও রয়েছে।
গণভোট, বয়সসীমা ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
সংবিধান সংস্কার নিয়ে গণভোট প্রশ্নে নির্বাচনের আগে বিএনপির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ছিল। যদিও নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন গণভোট-সম্পর্কিত অধ্যাদেশের বিষয়ে সরকার কী করবে—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। দলীয় সূত্র বলছে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে।
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছর করা, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা—এসব অধ্যাদেশ জারির সময় বিএনপি বা অন্য দলগুলোর প্রকাশ্য আপত্তি ছিল না। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নে তারেক রহমান বলেছেন, “আইন অনুযায়ী হবে।” নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি সরকার।
সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বাড়ানোর অধ্যাদেশও স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বাতিল হলে তরুণদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে—এ বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সামনে জটিল সিদ্ধান্ত
আইনজ্ঞদের মতে, যেসব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে না, সেগুলোর অধীনে সম্পন্ন কর্মকাণ্ডের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে। আবার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অধ্যাদেশগুলো উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র জটিলতার কথা স্বীকার করে বলছে, প্রেক্ষাপট, বাস্তবতা ও আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু অধ্যাদেশই সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করা হতে পারে।
ফলে এখন নজর ১২ মার্চের দিকে—সংসদ বসার পরই স্পষ্ট হবে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর ভাগ্যে ঠিক কী লেখা আছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা


