মামলা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে, গু’\ম ও বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কাজ করছে সরকার: আইনমন্ত্রী

সরকার মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে বেআইনি গ্রেপ্তার ও মামলা বাণিজ্যের মতো অনিয়ম অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (Md. Asaduzzaman)। একই সঙ্গে দেশে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত গু’\ম ও বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করার লক্ষ্যে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার (১১ মার্চ) রাজধানীর বিজয় সরণীতে সামরিক জাদুঘর মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। “সকল নারী ও বালিকার জন্য অধিকার, বিচার ও বাস্তবায়ন” শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (Manusher Jonno Foundation)।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণ, মানবাধিকার এবং নারীর অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই কার্ডগুলোর মালিকানা পরিবারের গৃহকর্ত্রী বা নারী সদস্যের নামে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি নতুন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ১১৭টি জনসভায় নারীদের জাগরণ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানানোর বিষয়টি স্মরণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, নীতিগতভাবে তিনি নারী কমিশন গঠনের পক্ষে। তবে দেশে একের পর এক কমিশন গঠনের কারণে অনেক সময় দায়িত্ব ও কার্যক্রমের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয় বলেও তিনি সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (National Human Rights Commission) সংক্রান্ত একটি অর্ডিন্যান্স জারি হয়েছে, যেখানে গু’\ম কমিশন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে মানবাধিকার কমিশনকে গু’\ম সংক্রান্ত তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হবে। এতে করে মানবাধিকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যদিও সরকারের নীতি স্পষ্ট—দেশে গু’\মের ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।

নারী কমিশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে অনেক সময় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় নারীরা। তাই তাদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। নারীরা সচেতন হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে বলেও তিনি মত দেন।

নারীর অধিকার প্রসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, তার দুই মেয়ে রয়েছে কিন্তু ছেলে সন্তান নেই। শরিয়া আইনের বিধান অনুযায়ী তিনি যে সম্পদ অর্জন করবেন তার পুরো অংশ মেয়েরা পাবে না। তাই এই বাস্তবতায় বিকল্প আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বেআইনি গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বেআইনি গ্রেপ্তার বাণিজ্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলার সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এই প্রবণতা আরও কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দুর্নীতি প্রতিরোধে নাগরিক সমাজের সহযোগিতাও কামনা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা যাতে ‘বেগম পাড়া’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে—সে বিষয়ে নাগরিক সমাজকে কার্যকর ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, এক প্রতিবেদনে টাইমস ম্যাগাজিন (Time Magazine) জানিয়েছে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এই বিপুল অর্থের একটি অংশ দিয়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ‘বেগম পাড়া’ গড়ে উঠেছে, মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, যদি বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করা যায় এবং দেশের অর্থ দেশের ভেতরেই থাকে, তাহলে সেই অর্থ দিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। নারীরা যখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে, তখন তারা অজ্ঞতা থেকে বের হয়ে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। এতে করে মৌলবাদের লক্ষ্যবস্তু থেকেও তারা বেরিয়ে আসতে পারবে এবং সমাজে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।

সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ড (Switzerland)-এর রাষ্ট্রদূত রেটো রেঙ্গলি, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. দাউদ মিয়া, বাংলাদেশে জাতিসংঘ (United Nations)-এর নারী প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান এবং মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *