দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী (Mohammad Kaysar Rashid Chowdhury) সম্প্রতি ভারত সফর শেষ করেছেন। সফরটি ছিল অনেকটাই ‘নিঃশব্দে’, তবে সেখানে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট (ThePrint)।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সরকারের পক্ষ থেকে এটি ঢাকা থেকে প্রথম বড় ধরনের নিরাপত্তা পর্যায়ের যোগাযোগ উদ্যোগ।
ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার দিল্লিতে ভারতের বহিরাগত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (Research and Analysis Wing–RAW)-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আরএস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্র দ্য প্রিন্টকে জানিয়েছে, বৈঠকে উভয় পক্ষ এমন একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে যে কোনো দেশের ভূখণ্ডই অন্য দেশের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
বৈঠকের আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা নিরাপত্তা সংলাপ ও যোগাযোগ চ্যানেলগুলো আবার চালু করা।
এর আগে মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেকটাই শীতল হয়ে পড়েছিল। তবে এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিত মিলছে।
উল্লেখ্য, সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের অংশ হিসেবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মেজর জেনারেল কায়সারকে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ মূলত দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের (এনএসএ) পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল।
পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে এনএসএ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন বলে জানা গেছে।
এদিকে নয়াদিল্লিও ধীরে ধীরে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এছাড়া গত মাসে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রিকে পাঠানোর মাধ্যমে দিল্লি তাদের ইতিবাচক বার্তা আরও স্পষ্ট করে।
ডিজিএফআই প্রধানের সাম্প্রতিক এই সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত’ সফর হিসেবে দেখানো হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ভারতের আশঙ্কা রয়েছে—বাংলাদেশে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চললেও কিছু কূটনৈতিক জট এখনো রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় অনুপস্থিতিতে মৃ’\ত্যু’\দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বর্তমানে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে ভারত।
তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি দ্য হিন্দু (The Hindu)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক ‘বন্দী’ হয়ে থাকবে না।


