আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশজুড়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে একটি পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বন ভবনে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘ভেষজ ও সুগন্ধি উদ্ভিদ সংরক্ষণ: স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য ও জীবিকার উন্নয়ন’।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবস্থা চালুর কথাও জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা চালু এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ সচেতন করে তুলতে স্কুলের পাঠ্যক্রমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, পরিবেশ রক্ষাকে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে তিনি স্মরণ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)-এর সময় শুরু হওয়া দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ অভিযানের কথা। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৭ সালে চালু হওয়া এনভায়রনমেন্ট পলিউশন কন্ট্রোল প্রজেক্ট পরবর্তীতে বর্তমানের বন অধিদফতর (Forest Department)-এ রূপান্তরিত হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, চট্টগ্রাম (Chattogram), ভোলা (Bhola) এবং পটুয়াখালী (Patuakhali) জেলার দ্বীপ ও উপকূলীয় চরাঞ্চলে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ বাগান তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে উপকূলজুড়ে একটি সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া সামাজিক বনায়নের আওতায় সড়ক, মহাসড়ক ও বাঁধের প্রান্তিক জমিতে ১১ লাখ চারা রোপণ করা হবে। এসব গাছের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হবে স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। নির্দিষ্ট সময় শেষে গাছ বিক্রির অর্থের বড় অংশ তারাই পাবে।
বসতবাড়ির আশপাশে সুপারি, আম, মেহগনি, শিলকড়ই, কদম, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরিতকি, কাঁঠাল ও চালতা সহ বিভিন্ন বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন রক্ষায় বনরক্ষীদের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রাণী ও প্রকৃতির মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান, এবং বন্যপ্রাণীরা প্রাকৃতিক পরিবেশেই নিজেদের রোগবালাইয়ের চিকিৎসা বা ‘সেলফ ট্রিটমেন্ট’ করে থাকে।
তিনি সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ সম্পদ রক্ষার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’ বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে এখন সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বন অধিদফতর এর প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ এবং আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস হোসেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বন অধিদফতরের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বন সংরক্ষক ও সাবেক আইইউসিএন প্রতিনিধি ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন এবং বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বন অধিদফতর ও পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তা, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।


