জ্বালানি সংকটে থমকে কুরিয়ার সেবা, পণ্য পচে বাড়ছে গ্রাহকের ক্ষোভ

দূরপাল্লা ও গণপরিবহনে তেলের রেশনিং পদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হলেও বাস্তবে জ্বালানি সংকট এখনো কাটেনি। রেশনিং তুলে নেওয়ার ঘোষণার পরও দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র—বাস ও ট্রাকের দীর্ঘ সারি, আর সেই সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় ক্লান্ত চালকরা। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কুরিয়ার ও লজিস্টিকস খাতে।

ডিপো থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন—সব জায়গাতেই তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পণ্যবাহী গাড়িগুলোর অনেকগুলোই রাস্তায় নামতে পারছে না। এতে কার্যত থমকে গেছে পণ্য পরিবহন। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহক, অনলাইন ব্যবসায়ী ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ওপর। পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় যেমন গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, তেমনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।

পচছে পণ্য, বাড়ছে অসন্তোষ
রাজধানী ঢাকা (Dhaka)সহ দেশের বিভিন্ন কুরিয়ার অফিসে এখন পার্সেলের স্তুপ জমে আছে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য—ফলমূল, শাকসবজি বা ঘরে তৈরি খাবার সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, কয়েক হাজার টাকার পণ্য কুরিয়ার অফিসেই আটকে থেকে পচে গেছে। অন্যদিকে গ্রাহকরা পণ্য হাতে না পেয়ে অর্ডার বাতিল করছেন। এর পুরো দায় ও আর্থিক ক্ষতির বোঝা গিয়ে পড়ছে বিক্রেতাদের ওপর। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

সেবা দিতে হিমশিম প্রতিষ্ঠানগুলো
কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (Courier Service Association)-এর কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন এবং জ্বালানির ঘাটতির কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেক গাড়িও রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না।

অনেক সময় ফিলিং স্টেশনে তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে, তা দীর্ঘ দূরত্বে চলা পণ্যবাহী ভ্যান বা ট্রাকের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

দ্বিমুখী সংকটে মালিকরা
কুরিয়ার ব্যবসায়ীদের মতে, তারা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। একদিকে তেলের জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়াও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

আগের চুক্তিতে নেওয়া বুকিংগুলো এখন দ্বিগুণ খরচে পাঠাতে হচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের ভারে নুয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে নতুন বুকিং গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।

গ্রাহক ভোগান্তি চরমে
জরুরি নথিপত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য—কিছুই সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, যেখানে দুই দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছানোর কথা ছিল, সেখানে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পার্সেল হাতে পাচ্ছেন না তারা।

কুরিয়ার অফিসগুলোর কাস্টমার কেয়ারে বারবার যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এতে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে এবং কুরিয়ার সেবার ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে।

অনিশ্চয়তায় কুরিয়ার সেবা
কুরিয়ার অফিসগুলোতে এখন প্রায়ই শোনা যাচ্ছে একই কথা—“গাড়ি ছাড়বে কি না নিশ্চিত নই, তেল পেলে জানাব।” জরুরি নথিপত্র, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কিংবা পরীক্ষার প্রবেশপত্র—কোনোটিই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না।

ফলে অনেক ক্ষেত্রে কুরিয়ার সেবা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা গ্রাহকদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিপর্যয়ের মুখে সাপ্লাই চেইন
অর্থনীতিবিদদের মতে, কুরিয়ার সার্ভিস কেবল পণ্য পরিবহন করে না; এটি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ‘সাপ্লাই চেইন’-এর একটি অংশ। লজিস্টিকস (Logistics) ব্যবস্থার এই ধারা ভেঙে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কুরিয়ার ও ই-কমার্স (E-commerce) খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এতে হাজারো মানুষ কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।

তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, পণ্যবাহী যানবাহনকে জরুরি সেবার আওতায় এনে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *