চোখের সামনে পদ্মায় ডুবে গেল বাস, অসহায় চেয়ে থাকা মানুষ—দৌলতদিয়ায় হৃদয়বিদারক আর্তনাদ

‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মায় পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না’—এই কথাগুলো বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া ঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহন তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেনের। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলের এই দুর্ঘটনা যেন মুহূর্তেই স্বাভাবিক একটি বিকেলকে রূপ দেয় আতঙ্ক, অসহায়তা আর কান্নায় ভরা এক ট্র্যাজেডিতে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটিতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর কয়েকজন কোনোভাবে বাসের ভেতর থেকে বের হয়ে পানির ওপর ভেসে উঠতে পারলেও অধিকাংশই আটকা পড়ে যান ডুবন্ত যানটির ভেতরে।

ঘটনার পরপরই উদ্ধার তৎপরতার জন্য বিআইডব্লিউটিএফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। কিছু সময়ের মধ্যেই উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি থেকে দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মনির হোসেন বলেন, বিকাল ৫টার কিছু পরে বাসটি দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে আসে। ঠিক তখনই একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য সেই ফেরিতে উঠতে না পারায় বাসটি আরেকটি ফেরির অপেক্ষায় ছিল। সেই সময় হঠাৎ একটি ফেরির ধাক্কায় বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

ফরিদপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ জানান, উদ্ধার হওয়া দুই নারীর মরদেহ গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ১১ জনকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয় গোয়ালন্দ ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট এবং আরিচা ফায়ার স্টেশনের একটি ডুবুরি দল। পাশাপাশি ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে আরও দুটি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে বলে জানানো হয়।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে। তাদের দাবি, উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করেছে এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলও এক ঘণ্টার বেশি সময় পর কার্যক্রম শুরু করে—যা অনেক সম্ভাব্য জীবন বাঁচানোর সুযোগ নষ্ট করেছে বলে মনে করছেন তারা।

বাসটির এক যাত্রী আবদুল আজিজুল জানান, তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গান্ধীমারা এলাকা থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন। দুর্ঘটনার পর তিনি সাঁতরে কোনোভাবে উপরে উঠতে পারলেও তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান এখনো নিখোঁজ। তার কণ্ঠে তখন শুধু আতঙ্ক আর অসহায়তার প্রতিধ্বনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, বাসটি কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে এসেছিল এবং দুর্ঘটনার পর খুব অল্পসংখ্যক যাত্রীই সাঁতরে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন।

এর আগে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময়ই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। একাধিক যাত্রীর দাবি, বাসটিতে ৪০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন—যাদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ বা আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *