নতুন ব্যাংক নোট নিয়ে সংসদে তীব্র উদ্বেগ—‘সহজেই জাল করা সম্ভব’ অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবর্তিত নতুন ডিজাইনের ব্যাংক নোটকে ঘিরে জনমনে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে—এমন দাবি তুলেছেন চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিন (Md. Jalal Uddin)। তিনি সতর্ক করে বলেন, নকল টাকার আশঙ্কা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন নোটের ডিজাইনে একাধিক ত্রুটি রয়েছে। নিম্নমানের গ্রাফিক্স, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের অভাব, সিকিউরিটি ফিচারের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিন্যাস—সব মিলিয়ে নোটটির সামগ্রিক অবয়ব পরিপূর্ণতা পায়নি। এর ফলে খুব সহজেই জাল করা সম্ভব হচ্ছে, এবং বাজারে জাল নোটের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এতে জনগণের ব্যাংক নোটের প্রতি আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ (Bangladesh Parliament)-এর ত্রয়োদশ অধিবেশনের ২৩তম দিনে ৭১ বিধিতে জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে এসব কথা তুলে ধরেন তিনি।

সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে জালাল উদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে নতুন নোট ছাপানো ও বাজারে ছাড়ার ফলে এই সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। একই অভিযোগ পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, নোটের নকশায় অপরিপক্কতা স্পষ্ট। এর ফলে সাধারণ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই নতুন নোট গ্রহণ বা বিনিময়ে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাংলাদেশে ব্যাংক নোট মুদ্রণের ইতিহাস তো নতুন নয়—চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাহলে কেন এই ধরনের ত্রুটি?” জনশ্রুতি ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, স্বল্প সময়ে নোট বাজারে ছাড়ার চাপ এবং ডিজাইন ও ড্রইংয়ে অপরিপক্কতার ছাপ এই সমস্যার মূল কারণ হতে পারে।

সংসদ সদস্য আরও অভিযোগ করেন, এই নোট মুদ্রণের সঙ্গে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারসাজি জড়িত থাকতে পারে। তার ভাষায়, এসব ব্যক্তি এখনও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থেকে পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

তিনি নোটিশে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ (Dr. Saleh Uddin Ahmed) জাতিসংঘ (United Nations)-এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী সরকার অবৈধভাবে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়েছিল। এর ফলে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, পণ্যের দাম বাড়ে, টাকার মান কমে এবং আয় বৈষম্য তীব্র হয়। বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে অর্থনীতি ক্রমশ পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত হয়।

তিনি আরও বলেন, ওই অর্থ ছাত্রজনতার আন্দোলন স্তিমিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। নির্বিচারে অত্যাচার, অবিচার, গুম, খু’\ন, গু’\লি’\বর্ষণের মতো ঘটনার পেছনেও এই অর্থ ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, এসব অপরাধ কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—অর্থের যোগানদাতারাও সমানভাবে দায়ী। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পায়।

জাল টাকার বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবৈধ অর্থ ছাপানো, জাল নোটের প্রসার এবং ত্রুটিপূর্ণ নতুন নোট চালু—সবই একই সূত্রে গাঁথা। এই পরিস্থিতি থেকে দেশ ও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি। এ লক্ষ্যে একটি সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

শেষে আইনগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় জালিয়াত চক্রকে গ্রেপ্তার করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে এসে আবার একই কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। একই ব্যক্তি বারবার গ্রেপ্তার হলেও উল্লেখযোগ্য শাস্তির মুখোমুখি হয় না। এর পেছনে আইনের দুর্বলতাকেই দায়ী করে তিনি দ্রুত আইন সংশোধনের দাবি জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *