মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং (Boeing)-এর সঙ্গে এক যুগান্তকারী চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস (Biman Bangladesh Airlines)। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এই চুক্তি সম্পন্ন হলে এটি হবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির ইতিহাসে বহর সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রাজধানীর একটি হোটেলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং অ্যাভিয়েশন খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত থাকবেন।
বিমানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের একজন প্রতিনিধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান (Khalilur Rahman), বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন (Brent T Christensen)-এর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় বিমান মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে। এর মধ্যে থাকবে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট। এসব উড়োজাহাজের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সমান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা সামাল দেওয়া, বহর আধুনিকায়ন এবং দীর্ঘ রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজগুলো ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দীর্ঘ রুটে ব্যবহৃত হবে, আর ৭৩৭ ম্যাক্স জেটগুলো পরিচালিত হবে আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের রুটে।
এই বড় ক্রয়াদেশ নিয়ে গত তিন বছর ধরে বোয়িং ও এয়ারবাস (Airbus)-এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। এর আগে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার কৌশলগত চাপ বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের পক্ষেই ঝুঁকেছে।
বিমানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ১৪টি উড়োজাহাজের জন্য মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদে কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, যার ফলে বছরে আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এই চুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে ৩০ এপ্রিলের মধ্যেই এই চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।
বর্তমানে বিমান ১৯টি উড়োজাহাজ দিয়ে আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনা করছে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৪১ সালের মধ্যে বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সূত্র জানায়, এই চুক্তির আওতায় প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের অক্টোবরে সরবরাহ করা হতে পারে এবং বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। এই ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকার বিমানের জন্য রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার পর এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আকাশপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আরও জোরদার হবে।


