চট্টগ্রাম নগরের এক বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ খ’\তনার জন্য ভর্তি হয়েছিল সাত বছরের শিশু মোহাম্মদ মোস্তফা। হাসিমুখে হাসপাতালে ঢোকা সেই শিশুটি আর জীবিত ফিরল না—ফিরল লা’\শ হয়ে। পরিবারের দাবি, অ্যানেসথেসিয়ার অপব্যবহারের কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যু। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো বক্তব্য দেয়নি।
সকাল সাড়ে ১০টা। শীতের সকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে আসে মোস্তফা। স্থান—চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট এলাকার সেইফ হেলথ কেয়ার হাসপাতাল। ভর্তি করা হয় একটি নির্ধারিত সার্জারির জন্য। বিছানায় শুয়ে হাসিমুখে মোস্তফা তুলেছিল শেষ ছবি—যা এখন তার পরিবারের কাছে বেঁচে থাকার একমাত্র স্মৃতি।
শিশুটির বাবা আবু মুসা জানান, “ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। হালকা নাশতা করিয়েছিলাম, কিন্তু চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী অপারেশনের আগে আর কিছু খাওয়াইনি। বিছানায় শুয়ে ছেলেটা তখনো হেসে বলছিল, ‘আব্বু, খুব খিদা লেগেছে।’”
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মোস্তফাকে সার্জারির জন্য কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ঘন্টা দুয়েক কেটে যায়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানান, শিশুটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতাল নিজেরাই অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে।
অ্যাম্বুলেন্সে সন্তানের শরীর স্পর্শ করে বাবার মনে হয়, কিছু একটা ভয়াবহ ঘটে গেছে। আবু মুসার ভাষায়, “শরীর ছিল বরফের মতো ঠান্ডা, পা দুটো বেঁকে গিয়েছিল। কোনো সাড়া নেই।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মোস্তফাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) ভর্তি করা হয়। রাত ১০টা ১০ মিনিটে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি মারা গেছে। মৃত্যুসনদে লেখা হয়, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে—অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক।
তবে মোস্তফার বাবা আবু মুসার অভিযোগ, “অ্যানেসথেসিয়ার অপব্যবহারের কারণেই আমার ছেলের এই মৃ’\ত্যু হয়েছে।” তিনি জানান, চিকিৎসক ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জুনাইদ চৌধুরী।
তবে ওই চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, “সাধারণত খ’\তনার সময় স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়, এবং এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া খুব কম দেখা যায়। তবে এই শিশুর ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা বিস্তারিত না দেখে বলা সম্ভব নয়।”
জানা গেছে, মোস্তফাকে আগেও, গত ১৬ ডিসেম্বর চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল। সেবার চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্রে লেখা ছিল, তার মূত্রনালিতে জন্মগত সমস্যা রয়েছে—‘গ্ল্যানুলার হাইপোস্প্যাডিয়াস’। সেই অনুযায়ী, খ’\তনা ও একটি ছোট সার্জারির প্রয়োজন ছিল, এবং সেখানে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের কথাও উল্লেখ ছিল।
মোস্তফার বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডি গ্রামে। সে পরিবারের বড় সন্তান। তার একটি দুই বছর বয়সী ছোট ভাই রয়েছে। বাবা আবু মুসা স্থানীয় একটি ডিশ কেব্ল সংস্থায় চাকরি করেন।
একটি সাধারণ চিকিৎসাজনিত প্রক্রিয়া—যা হতে পারত নিছক একদিনের অসুবিধা—সে প্রক্রিয়া পরিণত হলো এক পরিবারের জীবনভর বয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণায়। এখনো অস্পষ্ট, এই মৃ’\ত্যুর পেছনে কার গাফিলতি, কার ভুল সিদ্ধান্ত, কিংবা কার ব্যর্থতা ছিল—কিন্তু যে জীবন হারিয়ে গেল, তা আর কখনোই ফিরে আসবে না।


