আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবার দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেতাকে গানম্যান দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি মেহেরপুরের এক সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীকেও গানম্যান দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে— এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমকে (চরমোনাই পীর) গানম্যান দিচ্ছে সরকার। একই ধরনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে গানম্যান পাচ্ছেন গণসংহতি আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ও দলটির প্রধান সমন্বয়কারী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি)।
এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক অনিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে গানম্যান পাচ্ছেন বিএনপির মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মাসুদ অরুণ।
সূত্র জানায়, সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এই তিন রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত নির্দেশনার লিখিত অনুলিপি পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছেও পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে তারা অতি দ্রুত গানম্যান পাবেন।
এর আগে এনসিপির ছয় নেতা এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সম্পাদককে হুমকি পর্যালোচনা করে গানম্যান দেওয়ার কথা বলেছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল অব জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
কী আছে গানম্যান নিয়োগ নীতিমালায়?
গানম্যান নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয় ২০০১ সালের ২ ডিসেম্বর। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৪ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়— মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী, যারা সুনির্দিষ্ট প্রটেকশন বিধি অনুযায়ী পুলিশি নিরাপত্তা পাচ্ছেন, তাদের ব্যতীত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিশেষ নিরাপত্তার জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি বা কর্মকর্তা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে বাসা বা গাড়িতে পুলিশ প্রহরা পাচ্ছেন, তাদের সে প্রহরা বহাল থাকবে। এ তালিকায় রয়েছেন— রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং প্রধান বিচারপতির সন্তুষ্টি বা চাহিদার ভিত্তিতে তার পুত্র-কন্যা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও সচিবগণ (শুধু বাসায় প্রহরা)।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারপতি, সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এমন দলের প্রধান (সভাপতি), সংসদ সদস্য (সুনির্দিষ্ট আবেদনের ভিত্তিতে আদেশ জারি হলে), বিদেশি রাষ্ট্রদূত (বিশেষ আদেশক্রমে), বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা গানম্যান পেতে পারেন।
নীতিমালার বাইরে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা বিশিষ্ট ব্যক্তির পুলিশি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে— যদি কেউ তার জীবনের নিরাপত্তা বিপন্ন মনে করেন, তবে তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে অবহিত করবেন। পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনার আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেবেন। পর্যালোচনায় বিশেষ নিরাপত্তা প্রয়োজন মনে হলে যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে প্রস্তাব আইজিপির কাছে পাঠানো হবে। আইজিপি সুপারিশসহ তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করবে।
এই নীতিমালা অনুযায়ী সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে বা ছিল—এমন রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকরা সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করতে পারেন। আবেদন পর্যালোচনা শেষে সুপারিশসহ তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়।
২০০৬ সালের নির্দেশনা
২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর উল্লিখিত নীতিমালার আলোকে আরেকটি নির্দেশনা জারি করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিরাপত্তা হুমকি মূল্যায়ন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হয় না।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, এখন থেকে পুলিশ সদর দপ্তর, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা একক ও যৌথভাবে নিরাপত্তা হুমকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। তবে এবার সেই অবহিতকরণ প্রক্রিয়া উপেক্ষা করেই সরাসরি আগের নীতিমালার আলোকে গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
‘শুধু গানম্যান দিয়ে কারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, শুধু গানম্যান দিয়ে কারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গানম্যান দেওয়া একটি সাময়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা মাত্র। প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জোরদার করতে হবে, ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিতে হবে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যক্তি নিরাপত্তার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ, চলাচলের পথ, জনসমাগমস্থল এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। শুধু একজন বা দুইজন গানম্যান দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না; বরং এতে মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ তৈরি হতে পারে।
এর অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপুল সংখ্যক গানম্যান নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্রের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এই অর্থ যদি আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে তুলনামূলক কম খরচে অধিকসংখ্যক মানুষকে নিরাপত্তার আওতায় আনা সম্ভব।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গানম্যান দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে তা ধীরে ধীরে একটি প্রদর্শনমূলক সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে। এতে প্রকৃত ঝুঁকি বিবেচনার বদলে প্রভাব ও ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়বে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়লে রাষ্ট্রের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর জনবল সীমিত থাকায় জনসাধারণের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করবে।
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, গানম্যান দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই নির্বিচারে বা প্রথাগত সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়া উচিত নয়। এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা, যা কেবল সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই অনুমোদন দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, যথাযথ নীতিমালা ও স্বচ্ছ মানদণ্ড ছাড়া গানম্যান প্রদান করা হলে তা সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। এতে প্রভাবশালী একটি শ্রেণি অতিরিক্ত সুবিধা পায়, আর সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপেক্ষিত থাকে।
এ বিষয়ে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, এ পর্যন্ত কতজনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে, তা তার জানা নেই। তবে যারা আবেদন করছেন, তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখা তদন্ত করে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় গানম্যান দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, দেশে নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো শঙ্কা নেই। তবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপির ছয় নেতা এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সম্পাদকসহ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এনসিপির ছয় নেতা এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সম্পাদককে গানম্যান দেওয়া হয়েছে কি না—সে বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।


