শেরপুরে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারির মৃত্যু, দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

শেরপুর (Sherpur)-এর ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ঘটে যাওয়া সহিংস সংঘর্ষের জেরে গুরুতর আহত জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম মারা গেছেন। বুধবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এবং ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত শেরপুর–৩ আসনের প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে। সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকেরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে থাকেন। বসার জায়গা নিয়ে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সংঘর্ষ চলাকালে সভামঞ্চের সামনে থাকা শতাধিক চেয়ার ও কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর হয়। দুই দলের অন্তত ৩০ জন নেতা-কর্মী এতে আহত হন। জামায়াত নেতা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হলে তাঁকে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি ঘটলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টায় তিনি মারা যান।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. নজরুল ইসলাম জানান, রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে রেজাউল করিমকে মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক। তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে।

ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামীর শেরপুর–৩ আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান (বাদল) এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, “ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি সমর্থকদের বর্বরোচিত হামলায় আমাদের শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন।” তিনি আরও জানান, এ সংঘর্ষে জামায়াতের ৫০ জনেরও বেশি কর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এ বি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে এই হাত্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, “এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত রাজনৈতিক সন্ত্রাস, প্রকাশ্য খুন ও নির্বাচনী সহিংসতার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।”

এদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লুৎফর রহমান জানান, বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা। তারা নেতাকর্মীদের নিয়ে বেলা ২টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে এসে দেখেন বসার ৫০০ চেয়ারের সবগুলোতে জামায়াত-শিবির কর্মীরা দখল করে নিয়েছে। এসময় তারা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করে তাদের জায়গা করে দিতে বলেন। ইউএনও এসময় মঞ্চে উপস্থিত জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলকে সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানান। জামায়াত প্রার্থী তাদের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানালেও তার কথা কেউ কানে তোলেনি। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কর এক পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের লোকজন তাদের ওপর হামলা করেন। এতে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান, যুবদলের উপজেলার যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামসহ ২৫-৩০ জন আহত হন।

তিনি আরও জানান, অনুষ্ঠানস্থলে জামায়াত শিবিরের ৮০০-১০০০ নেতাকর্মী ছিলেন। তারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অটোরিকশা করে রড-লাঠিসোটা নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন। আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। আমরা মনে করেছি, ইস্তেহার পাঠ অনুষ্ঠানে এত লোকের প্রয়োজন নেই।

শেরপুর পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুল হাসান বলেন, বুধবার ঝিনাইগাতীতে উপজেলা পরিষদের ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে চেয়ারে বসা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উভয় দলের ১২ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। এরমধ্যে জামায়াতের একজন নেতা মারা গেছেন।

তিনি জানান, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানান এসপি কামরুল হাসান। তিনি জানান, এখনও কোনো পক্ষ মামলা করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিকেল ৫টার দিকে ঝিনাইগাতী বাজারে এক বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করে উপজেলা বিএনপি। এসময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা বিএনপির নিরীহ, শান্ত নেতাকর্মীদের রক্তাক্ত করেছে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি এ সময় কাউকে আইন হাতে না তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *