জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন শতাধিক।
এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে অন্তত ৬৪৭ জনের। এসব সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল প্রতিপক্ষের ওপর একতরফা হামলা অথবা উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সহিংসতাকে গণতন্ত্রের জন্য এক বিপজ্জনক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
এই গবেষণা চালিয়েছে সেন্টার ফর অলটারনেটিভ (Center for Alternatives) এর সহিংসতা পর্যবেক্ষণ সংস্থা বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (Bangladesh Peace Observatory)। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে ২১ দিন ও পরে ৭ দিন মিলিয়ে মোট ২৮ দিনের সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবমিলিয়ে ৬৪৭ জন নি’\হত ও ১৮ হাজার ১০১ জন আ’\হত হয়েছেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সহিংসতার মধ্যে ৩৯.৪৮% ছিল এক পক্ষের ওপর অপর পক্ষের হামলা, ২৯.৯৩% দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ, ২৩.৫০% অগ্নিসংযোগ বা সম্পত্তি ধ্বংস, এবং বাকিগুলো ‘মব’ হামলা, অপহরণ, গু’\লি’\কা’\ণ্ড, সহিংস বিক্ষোভ, মারামারি ও নাশকতা।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও এই সহিংসতার ধারা অব্যাহত রয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর দিন ২২ জানুয়ারি, লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জে ব্যানার ও ফেস্টুন টানানোকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে একই দুই দলের সংঘর্ষে আহত হন শ্রীবরদী উপজেলার জামায়াত নেতা রেজাউল করিম, যিনি পরে মা’\রা যান। গত চার দিনে অন্তত ১১ জেলায় সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগে ৮০ জনের বেশি আ’\হত হয়েছেন।
১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়লেও বিগত নির্বাচন গুলোর তুলনায় তাএখনো অনেক কম। এরমধ্যে ঢাকার ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির , কেরানীগঞ্জের বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা , শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা রেজাউল করিম নি’\হত হয়েছেন।
বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি বলছে, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়—নিহত হন ২৪৮ জন। অন্য নির্বাচনের সহিংসতা পরিসংখ্যান: ১৯৯১ সালে ৪৯ জন, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এ ৫১ জন, জুন ১৯৯৬-এ ৪৫ জন, ২০০৮ সালে ২১ জন, ২০১৪ সালে ১৪২ জন, ২০১৮ সালে ৬১ জন এবং চলতি ২০২৪ সালে (প্রথম দফায়) ৩০ জনের প্রা’\ণহানি হয়েছে।
এই সময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা ৮১৬টি, যাতে ৩১৭ জন নি’\হত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আ’\হত হয়েছেন। ২৩.৫০% সহিংসতা ছিল অগ্নিসংযোগ বা সম্পত্তি ধ্বংসের মাধ্যমে, যার ধারা এবারও অব্যাহত।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা রোধে রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন সুজন (Sushashoner Jonno Nagorik)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এর প্রধান কারণ। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, নির্বাচনকালীন সংঘর্ষ ঠেকাতে সরকারের উচিত আচরণবিধি ও প্রচলিত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণও নিশ্চিত করতে হবে।
তবে বিগত নির্বাচন গুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্য যে কোনো নির্বাচনের থেকে এখন পর্যন্ত সহিংসতার পরিমান অনেকটাই কম- তবে ঠিক কতদিন এমন পরিস্থিতি ধরে রাকা যাবে টা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।


