দেশের প্রথম ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-র একান্ত ব্যক্তিগত সময়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এক কর্তব্যনিষ্ঠ নারীর নাম—ফাতেমা বেগম। কারাজীবনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, গৃহবন্দিত্বের অসহায় দীর্ঘ মুহূর্ত, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডর—সবখানেই ৩৫ বছর বয়সী এই বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গীর নিবেদিত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
এখন, প্রথমবারের মতো তারেক রহমান (Tarique Rahman) দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় যখন সারা দেশে দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আনন্দোচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে, তখন এক ভিন্ন আবেগে ভাসছে ফাতেমা বেগমের পরিবারও। তাঁদের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, স্বীকৃতি ও সম্মানের অনুভূতি।
ফাতেমার পরিচয় আজ শুধু একজন গৃহপরিচারিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি যেন জিয়া পরিবারের হাসি-আনন্দ, দুঃসময় আর সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর কোনো রাজনৈতিক পদ নেই, নেই দলীয় পরিচয়। তবু ইতিহাসের কঠিনতম সময়গুলোয় তাঁর উপস্থিতি তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় আলাদা করে রেখেছে। অভিভাবকতুল্য খালেদা জিয়ার জন্য নিজের পরিবার ছেড়ে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন তাঁর পাশে। খালেদা জিয়ার পর এখন তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান (Zaima Rahman)-এর ছায়াসঙ্গী হিসেবে। এমনকি তারেক রহমানের ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও জাইমা রহমানের সঙ্গে ফাতেমার উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ-মাদার গ্রাম—সেখানেই ফাতেমা বেগমের বাড়ি। বুধবার তাঁর গ্রামের বাড়িতে কথা হয় মেয়ে জাকিয়া আক্তার (রিয়া), সেজ বোন মমতাজ বেগম এবং বৃদ্ধ বাবা রফিজুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ, গর্ব আর এক ধরনের আবেগঘন প্রশান্তি।
৭৫ বছর বয়সী রফিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সবাই এতই ভালো মানুষ! আল্লাহ সব সময় তাদের পাশে থাকবে। তারেক রহমান আমার মেয়ে ফাতেমাকে বোনের স্বীকৃতি দিয়েছেন। এতে আমি যে সম্মান পাইছি, এর চেয়ে বেশি আর কী আশা করা যায়? আমি যা আশা করেছি, তার চেয়ে বেশি পাইছি। আমার আর কিছুই চাওয়া-পাওয়ার নাই!’
ফাতেমা বেগমের মেয়ে জাকিয়া আক্তার রিয়া হাসিমুখে বলেন, ‘আমরা তো কোনো রাজনীতি করি না। আমার মা দীর্ঘদিন ধরে খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। আমরা তো খুশি হবই।’ ভোলার স্থানীয় কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এ অধ্যয়নরত।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ফাতেমা বেগমের পরিবারের মতো তাঁর এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে ভিন্ন এক আবেগের ঢেউ। স্থানীয় জেলে মো. ইউছুফ বলেন, ‘ফাতেমা আপা আমাদের এলাকার গর্ব। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য যেটুকু করেছেন, আজকাল নিজের আপন মানুষেও এটুকু করে না।’
চা-দোকানি ইব্রাহিমও একই সুরে বলেন, ‘তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ফাতেমার পরিবার যেমন খুশি, তেমনি আমরাও আনন্দিত।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে ফাতেমা বেগমই বড়। অন্য দুই বোন জোহরা বেগম ও নুরজাহান বেগমের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ভাই রুবেল ভোলা সদর উপজেলার স্থানীয় পরানগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ফাতেমা বেগমের মেয়ে রিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন এবং ছেলে রিফাত (১৭) স্থানীয় টবগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে বাড়ির যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন ফাতেমাই। একসময় অভাব-অনটনে কাটলেও বর্তমানে তাঁদের পরিবার স্বচ্ছলতার পথে এগিয়েছে—আর সেই পথচলার নেপথ্যে আছে এক নারীর নীরব ত্যাগ ও অটুট দায়িত্ববোধের গল্প।


