জাতীয় নাগরিক পার্টির হাসনাত আবদুল্লাহ (Hasnat Abdullah) এমপি হিসেবে শপথ নিলেন একটি স্পোর্টস জার্সি পরে। শপথের সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনপ্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে এমন পোশাক কি শোভনীয়?
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেকের মতে সংসদের মতো প্রতিষ্ঠানে জার্সি পরে শপথ নেওয়া ছিল ‘অপেশাদারি ও অসম্মানজনক’। অন্যদিকে হাসনাতের সমর্থকদের দাবি, আন্দোলনের সময় তিনি যে জার্সি পরতেন, সেটিই শপথের দিন বেছে নিয়ে জনগণের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি। তাদের মতে, এটি নিছক পোশাক নয়—একটি রাজনৈতিক বার্তা।
তবে সংসদ সদস্য কী পরছেন—বাংলাদেশে এ বিতর্ক নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পোশাক ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংসদের আচরণবিধি সম্পর্কে জানাশোনা আছে এমন বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের সংসদে উপস্থিত হওয়ার জন্য পোশাক সংক্রান্ত কোনো লিখিত, বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। তবে একটি প্রচলিত রেওয়াজ রয়েছে—যেখানে গ্রহণযোগ্য ও ফরমাল পোশাককেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বিশ্বের বহু দেশেই সংসদ বা আইনসভায় উপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে লিখিত ও অলিখিত ড্রেসকোড রয়েছে। কারণ, সংসদকে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
কেন সেই জার্সি?
শপথের দিন ঠিক কী ভাবনা থেকে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই জার্সিটি পরেছিলেন—তা জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে একই জার্সিতে দেখা গেছে।
জার্সিটির সামনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো। ইংরেজিতে লেখা ‘ইংলিশ’—যা মূলত বিভাগের নাম। পেছনে ইংরেজিতে লেখা ‘হাসনাত’, তার নিচে ১০ নম্বর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে বড় ব্যবধানে জয়ী হন হাসনাত আবদুল্লাহ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমর্থনে এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলি নিয়ে নির্বাচন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party)-এর দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্বে আছেন।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিতে মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus) ফ্রান্স থেকে ঢাকায় এলে শাহজালাল বিমানবন্দরে তাকেও একই ধরনের জার্সি পরে বরণ করতে গিয়েছিলেন হাসনাত। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেও সেই চেনা জার্সিতেই মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি।
‘অপেশাদারি’ নাকি ‘স্টেটমেন্ট’?
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ (Nizamuddin Ahmed) মনে করেন, “কাজটা ঠিক হয় নাই।” তার ভাষ্য, ফরমাল অনুষ্ঠানে সমাজের একটি গ্রহণযোগ্যতা থাকে। তবে তিনি এটাও বলেন, যেহেতু তারা একটি বিপ্লব করেছেন, তাই জার্সির মাধ্যমে হয়তো জুলাই বিপ্লবের চেতনা তুলে ধরতে চেয়েছেন হাসনাত। জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন—বিপ্লব এখনো শেষ হয়নি।
লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ সংসদে জার্সি পরা নিয়ে আপত্তিকে ‘শুচিবায়ু’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, এখানে কিছুটা স্টান্টবাজি থাকতে পারে, তবে টি-শার্টে সমস্যা দেখার কিছু নেই। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের পোশাকের বদলে উপনিবেশিক মানসিকতার শাসকদের পোশাককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়—যেন স্যুট-টাই পরলেই ভদ্রলোক হওয়া যায়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি স্মরণ করান মওলানা ভাসানী (Maulana Bhashani)-কে, যিনি লুঙ্গি পরে দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী নামে পরিচিত ছিলেন।
২৫ বছর ধরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কাভার করা সাংবাদিক ও গবেষক কামরান রেজা চৌধুরীর মতে, হাসনাতের জার্সি পরা ‘অ্যাটেনশন ড্র করার উপায়’ও হতে পারে। তার ভাষ্য, এটি রাজনীতিরই অংশ—একটি বার্তা দেওয়ার কৌশল। “সবাই পাঞ্জাবি-পাজামা পরে গেলেও তিনি জার্সি পরে গেছেন। হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন—আমি আগের মতোই আছি, জনগণের মানুষ হিসেবেই থাকব।” তার মতে, এতে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তেও পারে।
সংসদে ড্রেসকোড আছে?
১৭ ফেব্রুয়ারি বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে ড্রেসকোড নির্ধারিত ছিল—‘অফিসিয়াল/লাউঞ্জ স্যুট/মানানসই’ পোশাক।
তবে সকালে এমপিদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট ড্রেসকোড ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা।
অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ ও সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী—উভয়েরই বক্তব্য, কাগজে-কলমে সংসদের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক ড্রেসকোড নেই। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী এমপিরা সাধারণত পাঞ্জাবি-পাজামা, প্যান্ট-শার্ট, ব্লেজার পরেন; নারীরা শাড়ি পরেন। এটি অনেকটাই ব্যক্তিগত রুচির বিষয়, যদিও সংসদে সাধারণত ‘সুন্দর ড্রেস’ পরেই আসেন সদস্যরা।
অন্যান্য দেশে কী নিয়ম?
যুক্তরাজ্যের সংসদে এমপিদের জন্য স্পষ্ট ফরমাল ড্রেসের বিধান রয়েছে—পুরুষদের স্যুট-টাই, নারীদের ফরমাল পোশাক। টি-শার্ট, স্পোর্টস জার্সি বা স্লোগানযুক্ত পোশাক অনুচিত হিসেবে বিবেচিত। সেখানে পোশাককে ‘রেসপেক্ট অব দ্য হাউজ’—অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার অংশ ধরা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সংসদেও একই মাত্রার ফরমাল পোশাক প্রত্যাশিত। স্পোর্টসওয়্যার বা অতিরিক্ত ক্যাজুয়াল পোশাক সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ রয়েছে। গরম বা জরুরি পরিস্থিতিতে জ্যাকেট খোলা যেতে পারে, তবে নিয়ম অমান্যের সুযোগ নেই।
কমনওয়েলথভুক্ত বহু দেশেই রাজনৈতিক স্লোগানযুক্ত পোশাক নিষিদ্ধ। তবে অনেক রাষ্ট্রে ঐতিহ্যবাহী পোশাককে ফরমাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে স্বতন্ত্র ড্রেসকোড গড়ে তুলেছে।
আফ্রিকার জাম্বিয়ায় ‘কাউন্ডা স্যুট’ জনপ্রিয় হলেও কেনিয়ার সংসদে তা নিষিদ্ধ। ক্যারিবিয়ানে ‘কারিবা স্যুট’ একসময় গ্রহণযোগ্য হলেও পরে তা সংসদীয় পোশাক হিসেবে টেকেনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার রঙিন ‘মাদিবা স্যুট’ রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, আর ভারতে স্বাধীনতার পর ‘নেহরু কলার’ সাংস্কৃতিক মর্যাদার অংশ হয়।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট—পোশাক কেবল কাপড় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের গভীর সম্পর্ক। হাসনাতের জার্সি তাই শুধু একটি পোশাক নয়, বরং একটি প্রতীক—যা নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি।


