ভাষা আন্দোলনের নায়কদের ছবি মুছে ফেলা জাতির জন্য অপমান: রুমিন ফারহানা

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের সংসদ সদস্য এবং ভাষা সৈনিক অলি আহাদের কন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (Rumeen Farhana)।

তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস আজও নিরপেক্ষভাবে রচিত হয়নি—এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য দুঃখজনকই নয়, লজ্জাজনকও। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারাই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছে। ফলে ইতিহাসে আমরা কখনও কাউকে দেবতা, কখনও ইবলিশ হিসেবে দেখি। কিন্তু মাঝখানের সাধারণ মানুষ—যারা দোষে-গুণে মানুষ—তাদের প্রকৃত চরিত্র আর খুঁজে পাই না।”

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন (Ashuganj Upazila Administration) আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফে মোহাম্মদ ছড়া। উপস্থিত ছিলেন আশুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ শফিউল আলম চৌধুরী, উপজেলা জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এর আমীর মোঃ শাহজাহান ভুইয়া, উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক আমিনুল ইসলাম ডালিম এবং আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাব (Ashuganj Press Club)-এর প্রতিনিধি আল মামুনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুমিন ফারহানা আরও বলেন, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার ঘটনা বিরল—বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে। ভাষাভিত্তিক এত বড় গণআন্দোলনের নজিরও বিশ্বে খুব কম।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, এমন গৌরবময় ইতিহাসই আজ দলীয় ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক স্বার্থের চাপে আংশিক এবং বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ভাষা সৈনিক অলি আহাদ (Oli Ahad)-এর কন্যা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তার ভাষায়, “আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে। শিশুদের পাঠ্যপুস্তক কিংবা পরবর্তী পাঠ্যসূচিতে ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস নেই। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, জাতি হিসেবে লজ্জাজনক।”

সভায় অন্যান্য বক্তারাও মত দেন যে, কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে ফুল দেওয়া বা আলোচনা সভা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ভাষার উন্নয়ন, গবেষণা এবং চর্চায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালিত হলেও ভাষা আন্দোলনের গবেষণা ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও সীমিত বলেই মন্তব্য করেন তারা। ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে ইতিহাসের সত্যতা সংরক্ষণ এবং বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *