সংস্কার ঐকমত্যের সুপারিশে বিএনপি’র মিশ্র অবস্থান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি (BNP)—গতকাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে তাদের মতামত জমা দিয়েছে। দলটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে একই কাঠামোতে দেখার সুপারিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের সঙ্গেও একমত হয়নি দলটি। তবে বিচার বিভাগের বেশিরভাগ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে সম্মতি জানিয়েছে বিএনপি।

বিচার ও প্রশাসন সংস্কারে বিএনপির অবস্থান

বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত ৩১টি সুপারিশের মধ্যে চার-পাঁচটি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখিয়েছে। দলটির মতে, প্রশাসন সংস্কারের ২৬টি প্রস্তাবনার মধ্যে প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব। অপরদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক (ACC))-সংক্রান্ত ২০টি সুপারিশের মধ্যে ১১টির প্রতি সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি, ৭-৮টি বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি জানালেও একটি সুপারিশে ভিন্নমত পোষণ করেছে দলটি।

নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব

বিএনপির মতে, নির্বাচন কমিশনের (EC) ক্ষমতা খর্ব করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দলটি মনে করে, সীমানা পুনর্নির্ধারণের (Delimitation) ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকা উচিত। এ বিষয়ে বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার অক্ষুণ্ন রাখা হোক।

বিএনপি আরও বলেছে, নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের ২৭টি প্রস্তাবের বেশিরভাগই সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দলটি মনে করে, নির্বাচনী সংস্কার নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়, বরং এটি একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই সংবিধান সংশোধনের জন্য আলাদা উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংবিধান সংস্কারে বিএনপির ভিন্নমত

বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশের অনেক বিষয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। দলটি মনে করে:

  • ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে এক কাতারে আনা সমীচীন নয়।
  • রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের কোনো প্রয়োজন নেই।
  • সংবিধানের প্রস্তাবনাকে (Preamble) সম্পূর্ণ নতুনভাবে রচনা করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
  • নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের কাঠামোতে এমন পরিবর্তন আনা উচিত নয়, যা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন করে।

গণপরিষদ ও গণভোট প্রশ্নে বিএনপির মতামত

বিএনপি নতুন গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির মতে, বাংলাদেশ একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যেখানে ইতোমধ্যে সংবিধান বিদ্যমান। অতএব, গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনা করা প্রয়োজন নেই। তবে দলটি সংবিধানের গণতান্ত্রিক চরিত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

এছাড়া, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গণভোটের চেয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনই অধিক জরুরি বলে মনে করে বিএনপি।

সামগ্রিক ভাবে বিএনপি’র অবস্থান

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ নিয়ে বিএনপির মতামত স্পষ্ট: দলটি বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার কিছু সংস্কারের পক্ষে থাকলেও, সংবিধান পরিবর্তন, রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের নামে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্বের প্রস্তাবের বিপক্ষে রয়েছে। দলটি মনে করে, বর্তমান সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ, এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *