“অহংকার আর আত্মবিস্মৃতি—দুটোই সর্বনাশের পথ।”— জামায়াতে ইসলামি’র জন্য এখন এটাই খুব ভালো ভাবেই প্রযোজ্য। যুগ যুগ ধরে যাদের ছায়াতলে থেকে রাজনীতি করে গেছে দলটি ২০২৪ সালের ৫ জুলাইয়ের রাজনৈতিক অদলবদলের পর বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের বিজয়ের প্রেক্ষাপটে অনেকটাই ভুলে বসে তাদের অবস্থান। বিএনপির দীর্ঘদিনের সহচর হয়েও বর্তমান নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তারা বিএনপিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। প্রচার করা হয়েছে—বিএনপি দুর্বল, তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন না, নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না , এবং জামায়াতের নেতৃত্বেই রাজনীতির নতুন ধারা তৈরি হবে।
এই আত্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে। দলীয় সংস্থাকে দিয়ে একের পর এক জরিপে দাবি করা হয়, জনগণ এবার জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। এমনকি ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি তো দেখেছে, এবার জামায়াত’ ধরনের স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রথম বাস্তবতার মুখোমুখি হয় দলটি নির্বাচনে তারিখ ঘোষণার পর থেকেই আর তার চূড়ান্ত ফল দেখে ফেলে তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় থেকেই। মূলত বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে নামার সাথে সাথেই তারা বুঝে ফেলে নির্বাচনী মাঠে তাদের অবস্থান।
এরপর আবার ধাক্কা খায় হেফাজতের আমিরের বক্তব্যের পর—“জামায়াত কোনো ইসলামি দল নয়”। এরপর চরমোনাই পীরের ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ও অন্য দলগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠা জোটে ‘বিগ ব্রাদার’ আচরণের অভিযোগে সেই ঐক্যও ভেঙে পড়ার আশংকায় এখন অনেকটাই কোনঠাসা দলটি।
১ জানুয়ারিতে ১০১ জন আলেমের সম্মিলিত বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়, “জামায়াতের নেতৃত্বে কোনো ইসলামি জোট হতে পারে না”। এতে জামায়াতের “ইসলামি ধারার অভিভাবক” প্রচার ভেঙে পড়ে। এর পরপরই দলটির আড়ালে সক্রিয় ভারত-বিরোধী প্রচারণা মুখ থুবড়ে পড়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম Reuters-এর ফাঁস হওয়া রিপোর্টে। সেখানে উঠে আসে—জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ভারতের কূটনীতিকদের গোপন বৈঠকের তথ্য। দিনের বেলায় ভারত-বিরোধিতা, রাতের অন্ধকারে দিল্লি-সখ্য—এ দ্বিচারিতা দলটির মুখোশ খুলে দেয়।
তবে সবচেয়ে বড় চমক আসে জামায়াতের সর্বশেষ অবস্থান থেকে। নির্বাচনের আগে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো, তারেক রহমানকে অযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন দাবি করে বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার কৌশল—সবকিছুর পর হঠাৎ করে জামায়াত আমিরের পক্ষ থেকে তারেক রহমান-কে প্রস্তাব—“আগামী ৫ বছর সবাই মিলে দেশ গড়ার চিন্তা করি।”
নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে: কেন এখন? বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠের বাস্তবতা এখন জামায়াতের প্রতিকূলে। নির্বাচনের আগেই দলটি বুঝে গেছে—ক্ষমতার দ্বার নয়, প্রান্তের সীমানাতেই তাদের অবস্থান। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গণসংবর্ধনা এবং বেগম খালেদা জিয়া-র জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি সেই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. আবদুন নূর তুষার মন্তব্য করেছেন—“জামায়াত আমিরের প্রস্তাব অলিম্পিক গেমসের মতোই; যেখানে যারা দৌড়ে হেরে গেছেন, তাদের সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ করছেন। এমনটা রাজনীতিতে হতে পারে না।”
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়লেও এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠে নামে জামায়াত। তারা নিজস্ব প্রচারণায় দাবি করে—বিএনপি দুর্বল, ভারতপন্থী, তাদের নেতৃত্বে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নেই। অথচ এখন সেই বিএনপিকেই “সহযোগী” হিসেবে পাওয়ার আকুতি!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের “সবাই মিলে দেশ গড়ার” বার্তা উদারতার নিদর্শন হলেও, তার মানে এই নয় যে, প্রতিপক্ষ জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে। ২০০১ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেখানে জামায়াত ছিল জোটসঙ্গী, এখন ২০২৬-এ এসে তারা একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
অতএব, জামায়াতের পক্ষ থেকে আসা আকস্মিক সৌহার্দ্যের প্রস্তাব বাস্তবে তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও ব্যর্থ স্ট্র্যাটেজিরই ইঙ্গিত দেয়।


