কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বে মুসাব্বির হ’ ত্যা!

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জিনাত, বিল্লাল ও রিয়াজ নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে জিনাত শুটার আর বিল্লাল মূল পরিকল্পনাকারী। রিয়াজ তাদের সহযোগী। মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার প্রলোভন, গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিনের নিশ্চয়তা এবং বিপুল অংকের টাকার লোভ দেখিয়ে মুসাব্বিরকে হত্যার জন্য প্রধান শুটার জিনাতকে ভাড়া করে বিল্লাল। সে-ই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি পক্ষের সঙ্গে মুসাব্বিরের বিরোধ চলছিল। এ ছাড়া ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি পক্ষের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজতুরী বাজারের স্টার হোটেলের পাশের গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির (৪৫)। এ সময় কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার মুসাব্বিরের স্ত্রী তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

পারিবারিক ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মুসাব্বির একাধিক মামলার আসামি হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর তিনি আবার দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় তার রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিল্লাল এসি মেকানিক হিসেবে কাজ করলেও সে অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং মাদক কারবারে জড়িত। মুসাব্বিরকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সে জিনাতকে নানা প্রস্তাব দেয়। জিনাত অনেকদিন ধরেই বেকার বসে ছিল। বিল্লাল তার কাছে গিয়ে জানায়, একটি ‘বড় কাজ’ আছে। সেটা করতে পারলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে এবং তাকে একটি মোটরসাইকেলও কিনে দেওয়া হবে। এরপর ‘বড় কাজ’ অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার কথা জানানোর পর বলা হয়, ঘটনার পর তার পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা হবে। এরপরও কোনো কারণে গ্রেপ্তার হলে দ্রুত জামিনের মাধ্যমে তাকে বের করে আনা হবে। এসব প্রস্তাব দেওয়ার পর শুটার জিনাত হত্যা করতে রাজি হয়।

ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের পরপরই গোয়েন্দা ইউনিটের একাধিক টিম হত্যাকারীদের শনাক্তে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। এরপর গাজীপুরের বোর্ড বাজার থেকে জিনাতকে এবং মানিকগঞ্জ থেকে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া রিয়াজ নামে তাদের আরেক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরেক শুটার এবং আরও বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে খুনের কারণ এবং কাদের ইন্ধনে এই ঘটনা ঘটেছে, সে সম্পর্কে জানা যায়নি। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য বের হবে। এ ছাড়া যারা পলাতক আছে তাদের আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং মাস্টারমাইন্ডদের সম্পর্কে জানা যাবে।

ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে এবং হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন করা হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *