‘পেশাদার রাজনীতিকদের’ তুলনায় ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নতুন নয়। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই চিত্র বদলাচ্ছে না—বরং আরও প্রবল হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৪৪ শতাংশেরও বেশি ব্যবসায়ী। এই সংখ্যাটি বলছে, সংসদে রাজনীতিকে মূল পেশা হিসেবে দেখা প্রার্থীদের জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছে দিন দিন।
৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ ঘোষিত ১,৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে ব্যবসায়ী রয়েছেন ৮১৪ জন। সংখ্যার বিচারে, বৈধ প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ী প্রার্থী বিএনপি থেকে—১৯৪ জন। এরপর রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (৯৬ জন), জাতীয় পার্টি (৮৯ জন), জামায়াতে ইসলামী (৭৭ জন), গণঅধিকার পরিষদ (৪২ জন), খেলাফত মজলিস (২৬ জন), এনসিপি (১৬ জন), এবি পার্টি (৮ জন) এবং খেলাফত আন্দোলন (৩ জন)।
অন্যদিকে, পুরো ১,৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ২৬ জন আছেন যাঁদের হলফনামায় উল্লেখিত একমাত্র পেশা রাজনীতি। এই ২৬ জনের মধ্যে বিএনপি থেকে ৪, জামায়াতে ইসলামী থেকে ৩, জাতীয় পার্টি থেকে ১ জন প্রার্থী রয়েছেন। বাকি ১৬ জন বিভিন্ন ছোট রাজনৈতিক দলের ও ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলন থেকে কোনো প্রার্থীর একমাত্র পেশা রাজনীতি নয়।
শিক্ষকতা পেশায় থাকা প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যবসায়ীদের পরেই। মোট ২৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী থেকে রয়েছেন ৮০ জন, ইসলামী আন্দোলন থেকে ৭২ জন এবং খেলাফত মজলিস থেকে ২৩ জন। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও এবি পার্টি থেকে ৪ জন করে, এনসিপি ও খেলাফত আন্দোলন থেকে ৩ জন করে শিক্ষক প্রার্থী রয়েছেন।
তৃতীয় সর্বোচ্চ পেশা হিসেবে উঠে এসেছে আইনজীবী। এই শ্রেণির প্রার্থী আছেন মোট ২০৮ জন। এর মধ্যে জামায়াতের ৩৫, বিএনপির ২৫, জাতীয় পার্টির ২৩, স্বতন্ত্র ১২, ইসলামী আন্দোলনের ১১, এবি পার্টির ১০ ও গণঅধিকার পরিষদের ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন।
কৃষিজীবী প্রার্থীর সংখ্যা ৯৭। জামায়াতে ইসলামী থেকে সর্বোচ্চ ১২ জন, এরপর বিএনপি ও জাতীয় পার্টি থেকে ১১ জন করে প্রার্থী কৃষিজীবী হিসেবে হলফনামা দিয়েছেন।
চিকিৎসক পেশায় রয়েছেন ৪৮ জন। জামায়াতের প্রার্থী এখানে সবচেয়ে বেশি—১৩ জন। এরপর বিএনপি থেকে ১০ ও ইসলামী আন্দোলন থেকে ৩ জন চিকিৎসক প্রার্থী হয়েছেন।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন ২১ জন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী রয়েছেন ৫ জন, জামায়াতে ইসলামী থেকে ৩ জন।
পরামর্শক পেশায় প্রার্থী হয়েছেন ১৩ জন। এনসিপি থেকে ৩ জন, জামায়াতের ২, বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন ও এবি পার্টি থেকে একজন করে রয়েছেন এই তালিকায়।
এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন পেশা-সংমিশ্রণকারী প্রার্থীর দীর্ঘ তালিকা:
– ব্যবসা ও শিক্ষকতা পেশায় ২০ জন
– ব্যবসা ও কৃষি পেশায় ৩৫ জন
– ব্যবসা ও আইন পেশায় ৪ জন
– ব্যবসা ও চিকিৎসা পেশায় ৩ জন
– শিক্ষকতা ও কৃষি পেশায় ৪ জন
– শিক্ষকতা ও অন্যান্য পেশায় ৭ জন
– কৃষি ও সাবেক সরকারি কর্মচারী ১ জন
– রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষকতা ও আইনজীবী—একজন প্রার্থী এমন চার পেশায় যুক্ত
অন্যদিকে, গৃহশিক্ষকতা, বেসরকারি চাকরি ও নানা সাধারণ পেশায় যুক্ত ২৫৮ জন প্রার্থী আছেন। এমনকি কয়েকজন নারী প্রার্থীর পেশা হিসেবে ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিশ্লেষণে স্পষ্ট, রাজনৈতিক দলগুলো এখন আর কেবল ‘রাজনীতিকদের’ উপর নির্ভর করছে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পেশাগতভাবে শক্তিশালী, বিশেষত ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক চর্চার জায়গায় এই পরিবর্তন প্রশ্ন তোলে—সংসদ কি তবে ধীরে ধীরে পেশাজীবীদের দখলে চলে যাচ্ছে, না কি এটা কৌশলগত সমন্বয়?


