জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ইনকিলাব জরিপ: এগিয়ে বিএনপি, অনেকটাই পিছনে থেকে দ্বিতীয় জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। দুদিন পরেই ভোটগ্রহণ। দীর্ঘ ১৮ বছর পর একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছে দেশের জনগণ। এমন সময়ে দৈনিক ইনকিলাব (Dainik Inqilab) পরিচালিত জরিপে উঠে এসেছে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভোটারদের অভিমতের বিস্তারিত চিত্র।

১১ দিনব্যাপী এই জরিপটি পরিচালিত হয় ২৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়জুড়ে, দেশের ৫৩টি সংসদীয় আসন ও ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। অংশ নেন মোট ৯৬৬৯ জন ভোটার। এতে দেখা যায়, প্রায় ৬১ শতাংশ (৫৮৬০ জন) মনে করেন বিএনপি এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হবে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে ভোট দিতে চান ২৯ শতাংশ (২৮১২ জন) ভোটার।

জরিপ অনুযায়ী, গণভোটেও বিপুল ‘হ্যাঁ’ ভোটের ইঙ্গিত
এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জরিপে অংশ নেয়া ভোটারদের মধ্যে ৭৯.৫২ শতাংশ (৭৬৮৯ জন) ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। বিপরীতে ১৫.৪৫ শতাংশ (১৪৯৪ জন) ‘না’ বলবেন এবং ৫.০৩ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেননি।

ভোটারদের বয়স ও পেশাভিত্তিক বিবরণে উঠে এসেছে, ৩৬.৯৪ শতাংশ (৩৫৭২ জন) ১৮–৩০ বছর বয়সী তরুণ ভোটার। পেশার দিক থেকে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৭.৯৩ শতাংশ (২৭০৪ জন) শিক্ষার্থী, ২৫.৩০ শতাংশ (২৪৪৭ জন) ব্যবসায়ী, ২০.৬৫ শতাংশ (১৯৯৭ জন) চাকরিজীবী, ৯.৫৮ শতাংশ (৯২৭ জন) গৃহিণী, ৮.৫৫ শতাংশ (৮২৭ জন) শ্রমিক এবং ৬.৫৫ শতাংশ (৬১১ জন) কৃষক।

প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন এমন নতুন ভোটারের সংখ্যা ২৩২১ জন, যা মোট অংশগ্রহণকারীর ২৪ শতাংশ। তবে ৫.২৩ শতাংশ ভোটার (৫০৬ জন) জানিয়েছেন, তারা এবার ভোট দিতেই যাবেন না।

এক বছরে বিএনপির সামান্য পতন, জামায়াত জোটের চমকপ্রদ উত্থান
২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ইনকিলাবের জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির পক্ষে মত ছিল ৬১.০৮ শতাংশের; এবার তা সামান্য কমে হয়েছে ৬০.৬০ শতাংশ। তবে জামায়াতের সমর্থন দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে গেছে—আগে ছিল ১৪.৮২ শতাংশ, এবার তা দাঁড়িয়েছে ২৯.০৮ শতাংশে। এই উত্থানের পেছনে এনসিপি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে জামায়াতের জোটবদ্ধ হওয়া একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জরিপটি চালানো হয়েছে ঢাকা বিভাগের ১১টি, চট্টগ্রামের ১০টি, রংপুরের ৯টি, খুলনার ৬টি, রাজশাহীর ৬টি, ময়মনসিংহের ৪টি, বরিশালের ৪টি এবং সিলেটের ২টি আসনে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জরিপ চালানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিএনপি এগিয়ে আছে ৫টিতে, জামায়াত জোট এগিয়ে ৩টিতে।

জনপ্রধান হিসেবে পছন্দের দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান
জরিপে অংশ নেয়া ৯৬৬৯ জনের মধ্যে ৫৮৭০ জন (৬০.৭০%) মনে করেন তারেক রহমান (Tarique Rahman) প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তাদের মতে, তিনি বিএনপির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং বিদেশে থেকে ফিরে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির ধারা তৈরি করছেন। আবার ৩১৬৩ জন (৩২.৭২%) মনে করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান (Dr. Shafiqur Rahman) প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা চান এমনদের মধ্যে ১৯৮০ জন (২০.৪৭%) তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ৬৭৭ জন (৯.০০%) তার মা খালেদা জিয়া ও পিতা জিয়াউর রহমানের পরিচিতিকে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখেছেন।

ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে, ১৬৫৮ জন (১৭.১৪%) মনে করেন তিনি একজন সৎ ও যোগ্য নেতা। ৭৭৭ জন (৮.০৩%) বলেছেন, তিনি জনপ্রিয়, তাই প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি?
এ প্রশ্নে জরিপে অংশ নেয়া ৮২৬০ জন (৮৫.৪২%) বিশ্বাস করেন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তবে ৯৮৮ জন (১০.২১%) সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

ভোটের সম্ভাব্য ফলাফলের ইঙ্গিত
জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি ৫৩টি আসনের মধ্যে ৪৩টিতে জনসমর্থনে এগিয়ে। জামায়াত জোট এগিয়ে আছে ১০টি আসনে। ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিএনপি এগিয়ে ৫টিতে এবং জামায়াত জোট ৩টিতে।

তবে একাধিক আসন রয়েছে যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে হা’\ড্ডা’\হা’\ড্ডি ল’\ড়াই চলছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটাররা তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান; অপরদিকে ২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, নির্বাচনের পর ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

সব মিলিয়ে এই জরিপ একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছে, যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যাবে ৯ ফেব্রুয়ারির ভোটের পরই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *