আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস (Dr. Muhammad Yunus) বলেছেন, “ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে।”
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি বলেন, “যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে।”
ড. ইউনুস বলেন, “আজ আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। এটি সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।”
তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের, যাঁদের আত্মত্যাগে আজকের এই নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। “এই নির্বাচন ও গণভোট একান্তভাবেই সম্ভব হয়েছে জনগণের আত্মত্যাগ ও জাগরণের কারণে। আমরা তাদের কাছে চিরঋণী,”—বলেন তিনি।
ড. ইউনুস বলেন, “এবারের নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। রাজপথে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা, অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ হয়েছে, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক রূপ।”
ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো নির্ধারণে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না, আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি—বাংলাদেশ কি একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হবে, নাকি আবারও পুরোনো, অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বৃত্তে ফিরে যাবে।”
তিনি জানান, এবার ৫১টি রাজনৈতিক দল এবং দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী নির্বাচন করছেন, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ, যেখানে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
তবে ভাষণে তিনি কিছু সহিংস ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, “কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি, যা জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়।”
ভাষণে তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা দিয়ে ড. ইউনুস বলেন, “আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আজ সেই ভোট দেওয়ার ইতিহাস বদলানোর দিন এসেছে। তরুণদের স্বপ্ন ও নারীদের সংগ্রামই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে।”
নারী সমাজের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “নারীরাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। অর্থনীতি, পরিবার, রাজপথ—সবখানে নারীরা ছিলেন শক্তি হয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত ছিলেন। এই নির্বাচন তাদের জন্য এক নতুন সূচনা।”
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান বলেন, “এই ভোট আপনার প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি—ভোটকেন্দ্রে যান। ভয়কে পেছনে রেখে সাহসকে সামনে আনুন। কারণ, একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, ফ্যা’\সি’\বা’\দের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে।”
তিনি সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান, “ফলাফল যাই হোক, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের একটি অনিবার্য সত্য।”
ভাষণের শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনুস দেশবাসীর প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে পারি—এই বিশ্বাসই আমাদের শক্তি।”


