ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো ‘একক ইস্যুতে’ আটকে থাকবে না—এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir)। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু (The Hindu)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হা’\সিনা (Sheikh Hasina) ভারতে অবস্থান করলেও তা দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
তার ভাষায়, “আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হা’\সিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাকে শাস্তি দেওয়ার জনদাবি রয়েছে এবং আমরা মনে করি ভারতের উচিত তাকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু শেখ হা’\সিনাকে বাংলাদেশে না পাঠালেও তা বাণিজ্য সম্পর্কসহ বৃহত্তর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না। আমরা আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)। মঙ্গলবার নতুন সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিসভার শপথের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকার গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে বসেই হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব জোরদার করা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হবে।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হা’\সিনা। আন্দোলন দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal)। তাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার দিল্লির কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে গত ১৭ মাসে সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি ভারত।
মির্জা ফখরুল জানান, অভ্যুত্থানের সময় হ’\ত্যা’\কা’\ণ্ড ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শেখ হা’\সিনা ও তার সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে ‘জটিল অনেক বিষয়’ থাকলেও সেসবের কারণে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো থমকে থাকা উচিত নয়।
“আমেরিকা ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বহু জটিলতা আছে, তবু তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও আমাদের একটি ইস্যুতে আটকে থাকা উচিত নয়,” বলেন তিনি।
ইতিহাস টেনে ফখরুল বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নি’\হত হওয়ার পর তার দুই মেয়ে শেখ হা’\সিনা ও শেখ রেহানা ভারতে অবস্থান করছিলেন। সেই সময়ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইও ঢাকায় এসেছিলেন। “১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে জিয়াউর রহমান দিল্লি সফর করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এটাই রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি,” মন্তব্য করেন তিনি।
দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি আগামী বছরের মধ্যে নবায়ন করতে হবে। ফলে ফারাক্কার পানির বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসবে। সীমান্তে হ’\ত্যা’\কা’\ণ্ডের ঘটনাও আলোচনার টেবিলে আনতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। “এসব নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করতে পারি না। আমাদের কথা বলতে হবে। যারা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলে, তারা উন্মাদের মতো কথা বলে।”
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ফখরুল বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনাই গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক। ‘প্রতিশোধ ও সহিংসতার’ মনোভাব সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টের সহিংস অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় পর্যায়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় সফল হয়নি বলেও দাবি করেন ফখরুল। তার মতে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা পদে বেছে নিয়েছিলেন ‘অভ্যুত্থানের নেতারা’, যা রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় যথেষ্ট ছিল না।
বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিকে তিনি এমন একটি কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেন, যা বাণিজ্য, ব্যবসা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। “প্রযুক্তি শিক্ষায় ভারতের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে, আর আছে আমাদের বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ। তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ পেতে পারে,” বলেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ‘ঋণের বোঝা’ নিয়েই নতুন সরকারকে পথচলা শুরু করতে হবে। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে কোথায় অপচয় হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। “যেসব প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে দেবে, সেগুলো আমরা রাখব,” বলেন বিএনপি মহাসচিব।


