টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কী—সংবিধান কী বলছে, কেনই বা নিয়োগ দেওয়া হয়?

বিএনপি সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় তিনজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জন পূর্ণমন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। এই নিয়োগের পর থেকেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী আসলে কে, এবং কেন তাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়?

সহজভাবে বলতে গেলে, যিনি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হননি, কিন্তু বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা কিংবা নীতিনির্ধারণী সক্ষমতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় মন্ত্রিসভায় স্থান পান—তিনিই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। অর্থাৎ তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, তবুও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে মন্ত্রী করা হয়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ নিয়ম হলো—জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার মধ্য দিয়েই মন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম হয়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা সবসময় কেবল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে না। অর্থনীতি, আইন, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মতো জটিল ও বিশেষায়িত খাত দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে অনেক সময় প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার।

ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যদি সংশ্লিষ্ট খাতে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ না থাকেন, অথবা নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা ধরনের পেশাগত দক্ষতা প্রয়োজন মনে করা হয়, তখন সরকার বাইরে থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় যারা মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন, তারাই ‘টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী’ নামে পরিচিত। সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে তারা অন্যান্য মন্ত্রীদের মতোই রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন।

বাংলাদেশের সংবিধানও এই ব্যবস্থার স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধান (Constitution of Bangladesh)-এর ৫৬(২) অনুচ্ছেদ (Article 56(2) of the Constitution) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার অনধিক এক-দশমাংশ সদস্যকে এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পারেন, যারা সংসদ সদস্য নন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—তাদের অবশ্যই সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, তারা যদি নির্বাচনে অংশ নিতেন, তবে আইনগতভাবে অযোগ্য ঘোষিত হতেন না।

সরকার পরিচালনার স্বার্থে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী নিয়োগের পেছনে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণ কাজ করে।

প্রথমত, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান (Expertise)। তথ্যপ্রযুক্তি, পররাষ্ট্রনীতি বা অর্থনীতির মতো খাতে কখনও এমন দক্ষ ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও পেশাগতভাবে অত্যন্ত পারদর্শী। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মেধাবীদের গুরুত্ব (Promoting Talent)। দলের ভেতরে থাকা উচ্চশিক্ষিত বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সরাসরি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ভারসাম্য (Political Balance)। অনেক সময় দলের অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতারা নানা কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না বা নির্বাচনে পরাজিত হন। তবুও তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগাতে টেকনোক্র্যাট কোটার সুযোগ নেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে, টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কোনো ব্যতিক্রমী বা অসাংবিধানিক পদ নয়; বরং সংবিধানসম্মত একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদেরও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *