‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’—সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে—জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ

নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাত সোয়া ১০টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

ভাষণের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব হয়েছে। জনগণের ভোটে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়-সমতলের সব নাগরিকের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তার ভাষায়, স্বনির্ভর, নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কালে দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও দুর্নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণই হবে প্রধান অগ্রাধিকার। সারাদেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান, এসব নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। দলীয় প্রভাব বা জোর-জবরদস্তি নয়—রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসনই হবে শেষ কথা।

পবিত্র মাহে রামাদান উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামাদান আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কোনো কারণ নেই। অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে রাখার অনুরোধ করেন। একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।

ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রস্তুত বলে জানান তিনি। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ ও অভিযোগ গ্রহণে সরকার উন্মুক্ত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।

রামাদান মাসে ইফতার, তারাবীহ ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি কৃচ্ছ্রতা সাধনের আহ্বান জানান। সরকারি-বেসরকারি অফিসে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি ব্যবহার পরিহার করাকে তিনি দায়িত্বশীল আচরণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সরকারের মন্ত্রী ও বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপিদের জন্যও দৃষ্টান্ত স্থাপনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো এমপি সরকারি সুবিধায় ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না—এমন সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণের প্রতিফলন হিসেবেই তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন।

রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর যানজট ও জনদুর্ভোগ লাঘবে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সারা দেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেল-নৌ-সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয়ের কাজ চলছে। সহজ, সুলভ ও নিরাপদ রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শহরকেন্দ্রিক চাপ কমবে এবং পরিবেশের উন্নতিও হবে বলে মত দেন তিনি।

দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা অর্জন জরুরি। শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মেধা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েই সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’—সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে যে অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সরকারের। ভবিষ্যতেও জনগণের অব্যাহত সমর্থন কামনা করেন তিনি।

শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বা দেননি—সব নাগরিকের অধিকার সমান। দল-মত, ধর্ম-দর্শন যার যার—রাষ্ট্র সবার। আল্লাহর দরবারে দেশের কল্যাণ কামনা করে এবং পবিত্র রামাদানের প্রাক্কালে ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তৌফিক প্রার্থনা করে তিনি ভাষণ শেষ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *