মহানবীর (স.) ‘ন্যায়পরায়ণতা’ অনুসরণের অঙ্গীকার: জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ

বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মহানবী (স.)-এর ‘ন্যায়পরায়ণতা’র আদর্শ অনুসরণ করবে—এমন দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। তিনি জানিয়েছেন, বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে—দল থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধাও নেবেন না। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্তগুলোই ‘ন্যায়পরায়ণতা’র বাস্তব প্রতিফলন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কার্যদিবসে বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের কারণেই দেশে আবার অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড় কিংবা সমতলে বসবাসকারী সবাই এই দেশের সমান অংশীদার। প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ ভূমি গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা: প্রথম অগ্রাধিকার

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কার দুর্নীতি ও দুঃশাসনে বিপর্যস্ত এক ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার যাত্রা শুরু করেছে। জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন করা হবে।

সারাদেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান, এসব নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব বা জোরজবরদস্তি নয়—আইনের শাসনই হবে চূড়ান্ত কথা।

রমজানে মুনাফালোভিতা পরিহারের আহ্বান

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আত্মশুদ্ধির মর্ম উপলব্ধি করা গেলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। কিন্তু এ মাসে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রবণতা উদ্বেগজনক। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে আহ্বান জানান—রমজানকে মুনাফার মাস হিসেবে না দেখে সংযম ও নৈতিকতার চর্চার সময় হিসেবে বিবেচনা করতে। দ্রব্যমূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

তিনি বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতনের পর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সকল অনাচার-অনিয়মের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।

ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত। যে কোনো পরামর্শ বা অভিযোগ শোনারও আশ্বাস দেন তিনি। “এই সরকার আপনাদেরই সরকার, আপনারাই আমাদের শক্তি”—বলেন তিনি।

সেবা নিশ্চিত ও কৃচ্ছতা সাধনের ডাক

রমজান মাসে ইফতার, তারাবীহ ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অপচয় রোধ ও কৃচ্ছতা সাধনকে তিনি ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। অফিস-আদালতে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান।

সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ জনগণকে কৃচ্ছতা সাধনের আহ্বান জানানোর আগে মন্ত্রী ও এমপিদের দিয়েই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। পুনরায় বলেন, বিএনপির কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি বা প্লট নেবেন না—এটাই ‘ন্যায়পরায়ণতা’র পথ।

যানজট নিরসনে রেলভিত্তিক পরিকল্পনা

বিভাগীয় শহর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন যানজটের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, জনদুর্ভোগ লাঘব না হলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি। মানুষ যেন নিজ জেলা বা নিজ বাসা থেকে থেকেই সহজে অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন—সে লক্ষ্য নিয়ে সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। রেলব্যবস্থা সহজলভ্য ও নিরাপদ করা গেলে শহরকেন্দ্রিক নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি পরিবেশেরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দক্ষ জনশক্তি ও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’

সমস্যার পাশাপাশি দেশের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে এই জনসংখ্যাই হবে ‘জনসম্পদ’। তথ্যপ্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে, তখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে বলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েই সরকার যাত্রা শুরু করেছে।

প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, তখন তিনি বলেছিলেন—“আই হ্যাভ এ প্ল্যান”। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন স্থানে সেই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে, এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পালা।

শেষে তিনি বলেন, যারা ভোট দিয়েছেন, দেননি বা কাউকেই ভোট দেননি—সবার অধিকার সমান। দলমত-ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। একজন বাংলাদেশি হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *