ছাত্রদল করায় ১৮ বছর বিসিএসের গেজেট স্থগিত, অবশেষে “ডাক্তার সাহেব” যোগ দিলেন স্বাস্থ্য ক্যাডারে

২০০৭ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আনন্দটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি বেলাল হায়দারের জীবনে। সহপাঠীরা যখন একে একে সরকারি চাকরিতে যোগ দিচ্ছিলেন, তখন তার নামের পাশে ঝুলছিল একটাই শব্দ—‘গেজেট স্থগিত’। সেই একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই থামিয়ে দিয়েছিল তার সরকারি জীবনের পথচলা।

সেই স্থগিতাদেশের জট খুলতে লেগে গেল দীর্ঘ ১৮ বছর। অবশেষে প্রকাশিত হয়েছে গেজেট; তিনি এখন বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন চিকিৎসক। প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা আর আইনি লড়াইয়ের পর সরকারি পরিচয়ে ফিরলেন তিনি।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন বেলাল হায়দার (Belal Haider)। সাদা অ্যাপ্রন গায়ে সরকারি দায়িত্ব নেওয়ার মুহূর্তটি তার জন্য শুধু চাকরিতে যোগদান নয়; এটি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।

২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিসিএসে অংশ নেন তিনি। ২০০৭ সালে ফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ হলেও তার গেজেট প্রকাশ হয়নি। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রদল (Jatiyatabadi Chhatra Dal)-এর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তার গেজেট স্থগিত রাখা হয়। ফলে একই ব্যাচের অন্যরা যোগ দিলেও তিনি পারেননি সরকারি দায়িত্ব নিতে।

স্মৃতিচারণা করে বেলাল হায়দার বলেন, “ফল প্রকাশের দিনটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝলাম, আমার জন্য পথটা সহজ নয়—কারণ আমি রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছি।” সেই থেকে শুরু অপেক্ষা। দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং ক্লান্তিকর এক অপেক্ষা। পরবর্তীতে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। দীর্ঘদিন মামলার কার্যক্রম স্থবির থাকার পর গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ (Awami League) সরকারের পতনের পর বিষয়টি নতুন করে গতি পায়।

হাইকোর্ট বিভাগ (High Court Division)-এ শুনানি শেষে আদালত ২৭তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশ করার পাশাপাশি তাকে স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদায়নের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য বিভাগ তাকে নিয়োগ দেয়।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আদালতের রায় পেয়ে দেড় যুগ পর মনে হলো, বুকের ওপর থেকে একটা ভার নেমে গেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। এতদিনের কষ্ট ও অনিশ্চয়তার একটা মূল্য আছে।”

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল হায়দার দীর্ঘ এই সময়ে চিকিৎসা পেশা থেকে সরে যাননি। এমবিবিএস চিকিৎসক হিসেবে ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেছেন। সরকারি পরিচয় না থাকলেও স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন ‘ডাক্তার সাহেব’ই।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, “অনেক মানসিক কষ্টের মধ্যেও তিনি রোগীদের ফিরিয়ে দেননি। এখন সরকারি হাসপাতালে যোগ দেওয়ায় আমরা খুশি।”

পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকসংকটে ভুগছে। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের যোগদান স্থানীয়দের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিয়মিত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার আশা করছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বেলাল হায়দার বলেন, “এই ১৮ বছর আমাকে ধৈর্য শিখিয়েছে। মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে। এখন সরকারি দায়িত্বটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে চাই।”

দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি দায়িত্বে ফেরার এই মুহূর্ত তাই শুধু একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আইনি লড়াই এবং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার এক বাস্তব গল্প।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *