নতুন সরকারের দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে একটি শক্তিশালী ও পেশাদার কাঠামোয় দাঁড় করানোর ঘোষণার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (Ministry of Youth and Sports)।
১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই মন্ত্রণালয় একগুচ্ছ কর্মসূচি চূড়ান্ত করে। এসব পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে একটি পেশাদার ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে মাঠপর্যায়ে শত শত শিক্ষিত তরুণের পাশাপাশি কয়েক হাজার ক্রীড়া শিক্ষকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিটি উপজেলায় নিয়োগ হবে ক্রীড়া অফিসার
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় একজন করে ‘উপজেলা ক্রীড়া অফিসার’ নিয়োগের প্রস্তাব ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (Ministry of Public Administration)-এ পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। এখন এটি অনুমোদনের জন্য যাবে অর্থ মন্ত্রণালয় (Ministry of Finance)-এ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র মিললেই নিয়োগ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব-উল-আলম (Mahbub-ul-Alam) জানিয়েছেন, পুরো নিয়োগ কার্যক্রম দুটি ধাপে সম্পন্ন করা হবে। প্রথম ধাপে দেশের ২০১টি উপজেলায়, যেখানে ইতোমধ্যে মিনি স্টেডিয়াম রয়েছে, সেখানে ক্রীড়া অফিসার নিয়োগ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে অবশিষ্ট উপজেলাগুলোতেও একই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ফলে ধীরে ধীরে পুরো দেশ একটি সমন্বিত ক্রীড়া প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আসবে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক হাজার ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ততা বাড়বে, অন্যদিকে প্রশিক্ষিত খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
স্পোর্টস ভিলেজ ও শিল্প খাতে কর্মসংস্থান
নতুন পরিকল্পনায় শুধু মাঠের কার্যক্রম নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় আধুনিক ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক পদে বড় আকারের জনবল প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে একটি বিস্তৃত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া দেশে নিজস্ব ‘ক্রীড়া সরঞ্জাম ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই শিল্প স্থাপিত হলে উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবস্থাপনায় শিক্ষিত বেকারদের একটি বড় অংশ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক (Aminul Haque) এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত অ্যাথলেট ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হবে। এর ফলে জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্রীড়াঙ্গনের প্রশাসনিক কাজ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসাংবিধানিক প্রভাব বা দলীয়করণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মেধা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি পেশাদার পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সুষ্ঠু তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা মোকাবিলায় ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


