স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার শূন্যপদে প্রথম অধিবেশন: ত্রয়োদশ সংসদে নির্বাচন প্রক্রিয়া চলবে যেভাবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ (Bangladesh National Parliament)। রাষ্ট্রপতি আগামী ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। তবে শুরুর আগেই তৈরি হয়েছে এক সাংবিধানিক প্রশ্ন—স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার কারান্তরীণ। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে?

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-এর নেতৃত্বাধীন জোট সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে তার চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)-কে। অন্যদিকে সংসদীয় বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এনসিপি জোট তাদের আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছে।

সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) জানিয়েছেন, ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে এবং অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (President Md. Shahabuddin)।

কিন্তু এখানেই জটিলতা। সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর স্পিকার হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার ছিলেন শামসুল হক টুকু। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে স্পিকার পদত্যাগ করেন এবং ডেপুটি স্পিকার কারান্তরীণ থাকায় এখন দু’পদই কার্যত শূন্য।

এই বাস্তবতায় প্রথম অধিবেশন কীভাবে শুরু হবে—তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।

সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলছেন, পূর্ববর্তী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তির সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু করাতে হবে। সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠকেই সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে। কোনো একটি পদ শূন্য হলে সাত দিনের মধ্যে, অথবা সংসদ অধিবেশন না থাকলে পরবর্তী বৈঠকে তা পূরণ করতে হবে।

সংবিধানে আরও উল্লেখ রয়েছে—স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকলেও পরবর্তী উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দু’জনের কেউ কার্যকর না থাকায় কার্যপ্রণালী বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন।

অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনের ভাষায়, “এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দু’জনই অনুপস্থিত। তাই রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন ছাড়া অধিবেশন পরিচালনার বিকল্প নেই।” তার মতে, রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য সদস্যরা শপথ নেন। একই দিন বিকেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভারও শপথ অনুষ্ঠিত হয়।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও নির্দিষ্ট বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোনো সংসদ সদস্য স্পিকার পদে কারও নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ দেবেন; আরেকজন সদস্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করবেন। প্রস্তাবিত সদস্যের সম্মতিসূচক বিবৃতি নোটিশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এরপর বিষয়টি ভোটাভুটিতে যাবে। একাধিক প্রার্থী না থাকলে কণ্ঠভোটেই নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে।

প্রথা অনুযায়ী, স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বেই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন। তাদের শপথের মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ সংসদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।

বিদ্যমান সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুই পদই সাধারণত সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাবিত জুলাই সনদে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের সুপারিশ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সংসদীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

এমন এক প্রেক্ষাপটে ১২ মার্চের অধিবেশন শুধু নিয়মিত সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং তা হতে যাচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত, যেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনই নির্ধারণ করবে নতুন সংসদের কার্যক্রমের প্রারম্ভিক ছন্দ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *