বিএনপির গুলশান কার্যালয়—দলটির নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত এই বাড়িটি ২০০৮ সাল থেকে দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী। দীর্ঘ সময় ধরে নানা চাপ, উত্তেজনা ও সংঘাতের মুহূর্ত পেরিয়েছে গুলশানের এই ঠিকানা। ফ্যাসিস্ট সরকারের রোশানলে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ বন্দী জীবন কেটেছে এখানেই। বিএনপি চেয়ারপারসনকে বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই বাড়ির সামনেই। টানা দেড় দশক দিনরাত পুলিশি বেষ্টনীতে আবদ্ধ ছিল বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে পরিচিত গুলশানের এই বাড়িটি।
অনেকেই ধরে নেন বাড়িটির মালিক বিএনপি। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই বাড়িটির মালিক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের (Zakaria Taher)। ২০০৮ সালের চরম প্রতিকূল সময়ে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিজের বাড়িটি ছেড়ে দেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সীমাহীন চাপের মধ্যেও দলীয় কার্যালয় সরিয়ে নিতে রাজি হননি জাকারিয়া তাহের। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই মনে করেন, সেই একনিষ্ঠতারই প্রতিদান মিলেছে মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার মাধ্যমে।
কুমিল্লা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত জাকারিয়া তাহের তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিকুল আলম হেলালের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ভোট পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, আসনের সবকটি কেন্দ্রে বিজয়ী হয়ে আলাদা এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। ভোটের ব্যবধান ও কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল তাকে এলাকায় অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
নতুন মন্ত্রিসভার অন্যতম শীর্ষ ধনী মন্ত্রীও তিনি। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, শুধু তার নিজের নামে রয়েছে ২৩১ কোটি ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৭১ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। সম্পদের পরিমাণ তাকে মন্ত্রিসভার আলোচিত ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রামে জন্ম জাকারিয়া তাহেরের। ১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া তাহের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে বিএসসি সম্পন্ন করেছেন। তার বাবা প্রয়াত এ কে এম আবু তাহের কুমিল্লা-৮ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর স্থানীয় রাজনীতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাকারিয়া তাহের।
২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে একই প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেও পরাজয়ের মুখ দেখেন তিনি। তবে এবার কুমিল্লা-৮ আসনেই লড়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন। এই প্রত্যাবর্তন তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দলীয় রাজনীতিতে জাকারিয়া তাহের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তার বাবা এ কে এম আবু তাহের দেশের অন্যতম শিল্পপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন। জাকারিয়া তাহের নিজেও ন্যাশনাল ব্যাংকের একজন পরিচালক।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমেও বরুড়ায় তাহের পরিবার পরিচিত ও জনপ্রিয়। জাকারিয়া তাহের মন্ত্রী হওয়ায় এলাকায় উৎসবের আমেজ। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—কাজের মাধ্যমে শুধু কুমিল্লা নয়, সারাদেশের মানুষের মন জয় করবেন বরুড়ার এই সন্তান।


