বাংলাদেশের সৃজনশীল অঙ্গনের নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব তুলে ধরে তিন মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী চারু ও কারুশিল্পী দল (Bangladesh Jatiyatabadi Charu O Karushilpi Dal)-এর নেতৃবৃন্দ ও উপদেষ্টামণ্ডলী। আজ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী (Nitai Roy Chowdhury), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (Md. Asaduzzaman) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত (M. Rashiduzzaman Millat)।
সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাকালে দলটির প্রতিনিধিরা দেশের চারু ও কারুশিল্পের বর্তমান বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তারা বলেন, বিশ্ববাজারে শিল্পনির্মাণ পেশা যেমন সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বাংলাদেশে তেমন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কাঠামোগত সহায়তা এখনো গড়ে ওঠেনি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের আনুমানিক প্রায় দশ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সৃজনশীল পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের পেশাগত মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটেই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ২১ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।
দলটির প্রস্তাবনার প্রথম সারিতেই রয়েছে ‘সৃজনশীল শিক্ষা অধিদপ্তর’ নামে একটি নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি। পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ‘চারু ও কারুকলা’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং পাঠ্যক্রমে ‘শিল্পকলার ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্ব’ অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কর্মমুখী শিক্ষাকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সৃজনশীল পেশাভিত্তিক আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
এছাড়া শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমভিত্তিক ‘হাতেকলমে শিক্ষাব্যবস্থা’ চালু করা, অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে প্রস্তাবনায়। দলটির মতে, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পমাধ্যমে দক্ষতা অর্জন ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্পমেয়াদি ডিপ্লোমা ডিগ্রিকে যোগ্যতা হিসেবে মূল্যায়ন বন্ধ করে বিএফএ (পাস), অনার্স ও এমএফএ ডিগ্রিধারী দক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়েছে। পাশাপাশি চারু ও কারুশিল্প বিষয়ে উদ্ভাবনধর্মী গবেষণার জন্য মেধাবৃত্তি চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশি চারু ও কারুশিল্পের মৌলিকত্ব রক্ষার প্রশ্নেও তারা সরব। নান্দনিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আড়ালে বিদেশি আগ্রাসন থেকে দেশীয় শিল্পরূপকে সুরক্ষা দিতে ‘জাতীয় চারু ও কারুশিল্প কমিশন’ গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘চারু ও কারুশিল্প উন্নয়ন বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
শিল্পীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা সহায়তা তহবিল গঠন, স্বাস্থ্যবীমা চালু, প্রান্তিক পর্যায়ের শিল্পীদের জন্য স্বাস্থ্য-কার্ড প্রদান এবং চিকিৎসা ব্যয়ে ভর্তুকির দাবি জানানো হয়েছে। বয়স্ক চারু ও কারুশিল্পীদের জন্য মাসিক ভাতা চালুর বিষয়টিও প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের চারু ও কারুশিল্পকে তুলে ধরার লক্ষ্যে দেশে আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলন ও কর্মশালা আয়োজন, গুণী শিল্পীদের ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে স্বীকৃতি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের গ্যালারি ও বিপণন কাঠামো স্থাপন, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজন, চারু ও কারুপণ্য রপ্তানিতে ভর্তুকি ও ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা প্রদান, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পীদের রয়্যালটি নিশ্চিত করার দাবিও উত্থাপন করা হয়।
সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও আলোচনায় উঠে আসে সৃজনশীল খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। দলটির নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, তাদের প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার চারু ও কারুশিল্প খাতকে একটি সুসংগঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


