মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অভিঘাত এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাংলাদেশ (Bangladesh)-এর অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায়। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি নির্ভর অর্থনীতির কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও অনিশ্চয়তার ছায়া ঘন হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে, যখন ক্ষমতায় আসার পর তাদের রাজনৈতিক সময়কাল এখনও খুব বেশি দূর গড়ায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইরান (Iran)-কে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ইতোমধ্যেই অস্থির হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে স্পট মার্কেটে, যেখানে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বড় অংশেই আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি তেলের মজুদও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে এখন যে মজুদ রয়েছে তা এক মাসেরও কম সময়ের জন্য যথেষ্ট। অথচ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অন্তত ৪৫ দিনের জ্বালানি রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন বলে ধরা হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ—দুটিই সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তার প্রভাব পড়া প্রায় অনিবার্য। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে সেবা খাতের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নতুন সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঘোষিত বা পরিকল্পিত সহায়তা কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে যদি মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে হলে দ্রুত জ্বালানি আমদানি বাড়ানো ছাড়া আপাতত বিকল্প খুব একটা নেই। কিন্তু এখানেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় মেটাতে হলে রিজার্ভ থেকেই অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ভারত (India), ভিয়েতনাম (Vietnam) এবং ইন্দোনেশিয়া (Indonesia)-এর মতো দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে জ্বালানি আমদানির পথ খোঁজা যেতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাই বাংলাদেশের সামনে এখন একাধিক সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য এটি হয়ে উঠছে এক কঠিন অর্থনৈতিক পরীক্ষার সময়।


