ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাকযোগে দেওয়া পোস্টাল ভোটের ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পোস্টাল ভোটের ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ পেয়েছে দলটি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP) পেয়েছে ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট।
শনিবার (৭ মার্চ) নির্বাচন কমিশন (Election Commission)-এর প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে আরও দেখা গেছে, দুটি সংসদীয় আসনে জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ডাকযোগে দেওয়া এই ভোট।
প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন। এই ব্যবস্থার আওতায় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এবং কয়েদিরাও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
ইসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পোস্টাল ভোট দেওয়ার জন্য মোট ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে মোট ভোট পড়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪টি। বাতিল ভোটের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৮৯৮টি। ফলে মোট ভোট পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ৬৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি পেয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ পোস্টাল ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party – NCP) পেয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট। শতাংশের হিসাবে জামায়াতের প্রাপ্তি ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিএনপির ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং এনসিপির ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
পোস্টাল ভোটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১ আসনে। এই দুই আসনের ফলাফল ডাকযোগে দেওয়া ভোট যুক্ত হওয়ার পর পরিবর্তিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান (Rafiqul Islam Khan) সাধারণ ভোটে পান ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী এম. আকবর আলী পান ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট, ফলে শুরুতে এগিয়ে ছিলেন বিএনপি প্রার্থী। কিন্তু পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পোস্টাল ভোটে রফিকুল ইসলাম খান পান ২ হাজার ১৭৯ ভোট এবং এম. আকবর আলী পান ৮২০ ভোট। ফলে মোট হিসাবে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াত প্রার্থী।
একইভাবে মাদারীপুর-১ আসনেও ফলাফল বদলে দেয় পোস্টাল ভোট। এখানে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার সাধারণ ভোটে পেয়েছিলেন ৬৪ হাজার ২৯১ ভোট, আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা পেয়েছিলেন ৬৩ হাজার ৫১১ ভোট। কিন্তু পোস্টাল ভোটে হানজালা পান ১ হাজার ৩৯৮ ভোট, আর বিএনপির নাদিরা আক্তার পান ২৩৩ ভোট। ফলে মোট হিসাবে ৩৮৫ ভোটে এগিয়ে গিয়ে বিজয়ী হন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী।
ডাকযোগে ভোটের হার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি পোস্টাল ভোট পড়েছে রংপুর-২ আসনে। এখানে ভোটের হার ছিল ৮৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। বিপরীতে পঞ্চগড়-২, ঠাকুরগাঁও-২, ঠাকুরগাঁও-৩ এবং চট্টগ্রাম-১ আসনে পোস্টাল ভোটের হার ছিল শূন্য শতাংশ।
হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যেও পোস্টাল ভোটে বিভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman) পেয়েছেন ১ হাজার ২৫৬ পোস্টাল ভোট। একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জামান পেয়েছেন ২ হাজার ৩২৮ ভোট। বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমান পেয়েছেন ১ হাজার ৫৪৫ পোস্টাল ভোট, আর জামায়াত প্রার্থী মো. আবিদুর রহমান পেয়েছেন ১ হাজার ৬২ ভোট।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান পেয়েছেন ২ হাজার ৭৯০ পোস্টাল ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ১ হাজার ৯২০ ভোট।
ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৪ পোস্টাল ভোট। বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী এম. এ. কাইয়ুম পেয়েছেন ৮৬৪ ভোট।
কুমিল্লা-৪ আসনে ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ পোস্টাল ভোট পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৬টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ২৪১ ভোট। জেলার প্রতিটি আসনেই জামায়াত জোটের প্রার্থীরা তুলনামূলক বেশি পোস্টাল ভোট পেয়েছেন বলে ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে চাঁদপুর, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরেও।
অন্যদিকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছিল ফেনী-৩ আসনে। এই আসনে মোট ১৬ হাজার ৩৮ জন ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। এখানে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু পেয়েছেন ৩ হাজার ১৯৬ পোস্টাল ভোট। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৩৯ ভোট।


