একাধিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ মিলতে পারে এক শর্তে, নারী প্রধান পরিবার বাছাইয়ে কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া

নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নতুন এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। নারী প্রধান পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)।

সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় (Ministry of Social Welfare) এই কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরে। জানানো হয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে, কড়াইল বস্তি সংলগ্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে।

প্রথম ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিবারের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করতে একাধিক স্তরে কমিটি গঠন করা হয়—ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এসব কমিটি কাজ করে।

ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী—যেমন টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল—এমনকি রেমিট্যান্স প্রবাহ সম্পর্কিত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে এসব তথ্য ইউনিয়ন কমিটি যাচাই করে এবং উপজেলা কমিটি পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপকারভোগীর চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করে।

পাইলটিং পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সফটওয়্যারের মাধ্যমে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়—হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত।

এর মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা গ্রহণ, সরকারি চাকরি, পেনশনসহ বিভিন্ন কারণে বাদ পড়ে শেষ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা পাওয়ার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারভিত্তিক হওয়ায় উপকারভোগী নির্বাচনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি করে আধুনিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে। স্পর্শবিহীন (Contactless) চিপ সম্বলিত এই কার্ডে QR Code এবং NFC (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা কার্ডটিকে নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য করবে।

নিয়ম অনুযায়ী, একটি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যের জন্য একটি কার্ড দেওয়া হবে। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—যে নারী গৃহপ্রধান ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত হবেন, তিনি যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান, তাহলে সেই সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিদ্যমান ভাতা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।

পাইলটিং পর্যায়ে নির্বাচিত উপকারভোগীরা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ভবিষ্যতে একই মূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে কিছু শর্তের কারণে অনেক পরিবার এই সুবিধা পাবে না। যদি পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন বা ভাতা পান, অথবা নারী গৃহপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে কর্মরত থাকেন, তাহলে সেই পরিবার ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবে না।

একইভাবে, কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে, বিলাসবহুল সম্পদ—যেমন গাড়ি বা এসি—থাকলে, কিংবা ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও সেই পরিবার এই সুবিধার বাইরে থাকবে।

ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ অর্থ সরাসরি জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে উপকারভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। তথ্য সংগ্রহের সময়ই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে কোনো বিলম্ব বা ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।

সরকার জানিয়েছে, পাইলটিং পর্যায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আগামী জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৩৮ দশমিক ০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ১৫ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রায় ৬৬ দশমিক ০৬ শতাংশ—সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ১২ দশমিক ৯২ কোটি টাকা তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম তৈরি, কার্ড প্রস্তুতসহ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করা হবে।

‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬’ ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *