দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant) এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির পথে। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী এপ্রিল মাসে এখানে নিউক্লিয়ার ফুয়েল লোড করা হবে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। শুরুতে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (Nuclear Power Company Bangladesh Limited) এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (Ministry of Science and Technology)-এর কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, প্রথম ইউনিটের হট রান ও কোল্ড রানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ের ইন্সপেকশন কার্যক্রম চলছে। এই ধাপ শেষ হলেই ফুয়েল লোডিং শুরু করা হবে এবং ধাপে ধাপে পাওয়ার স্টার্টআপ প্রক্রিয়া চালু করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ডিসেম্বর নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
গত রবিবার (৮ মার্চ) প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে ফকির মাহবুব আনাম (Fakir Mahbub Anam) বলেন, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবে। তার মতে, এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়—বরং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর একটি অবকাঠামো, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় শুরুতে ধরা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে সময়ের সঙ্গে ব্যয় বেড়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কভিড মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব—এই তিনটি প্রধান কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদও বাড়াতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূল চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ইউনিট চালুর সময়সীমা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবর। তবে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম ইউনিটের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বর।
এই সময়সীমা পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গত বছরের ২০ জুন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (Bangladesh Atomic Energy Commission) রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুন মাসেই প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন—অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়িয়ে ডিসেম্বর নাগাদ পূর্ণ সক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন ইতোমধ্যে প্রস্তুত করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (Power Grid Company of Bangladesh)। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে। বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি ও লোড ম্যানেজমেন্ট নিয়েও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মৌসুম এলেই বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই সময় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে হলে উৎপাদন খরচও অনেক বেশি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে অন্তত ১,২০০ মেগাওয়াট স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাবে, যা ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহিদুল হাসান জানান, ফুয়েল লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত পরিদর্শন শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হলে আগামী মাসেই ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু করা হবে।


