ইরানি নারী ফুটবল দলের মোট সাত সদস্যকে আশ্রয় দিল অস্ট্রেলিয়া

ইরানের নারী ফুটবল দলের আরও দুই সদস্যকে অস্থায়ী মানবিক ভিসার মাধ্যমে আশ্রয় দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া (Australia) সরকার। বিষয়টি বুধবার নিশ্চিত করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক (Tony Burke)। তাদের একজন খেলোয়াড় এবং অন্যজন দলের সাপোর্ট স্টাফ সদস্য।

মঙ্গলবার রাতে দলটি অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার আগেই তারা আশ্রয়ের আবেদন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সিডনি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা চেকপয়েন্ট পার হওয়ার সময় অস্ট্রেলিয়ান কর্মকর্তারা ও দোভাষীরা ইরানি দলের তত্ত্বাবধায়কদের অনুপস্থিতিতে প্রতিটি নারী সদস্যকে আলাদাভাবে ডেকে আশ্রয়ের সুযোগ দেন।

বার্ক বলেন, “তাদের একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমরা নিশ্চিত করেছি যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো বা চাপ থাকবে না।”

দলের এক সদস্য সিডনি থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটে ওঠা বিলম্বিত করেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশে ফিরবেন কি না তা নিয়ে ভাবার সময় নেন। শেষ পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়াতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

এই দুইজনকে যুক্ত করে এখন পর্যন্ত মোট সাতজন ইরানি নারী ফুটবল দলের সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় অস্থায়ী মানবিক ভিসা পেয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (Australian Broadcasting Corporation–ABC)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ভিসা ১২ মাসের জন্য বৈধ এবং ইউক্রেন, ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তানের নাগরিকদের জন্য চালু থাকা একই ধরনের মানবিক ভিসা কর্মসূচির অংশ। এ ধরনের ভিসা ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগও তৈরি করতে পারে।

এদিকে দলটি যখন গোল্ড কোস্টের হোটেল থেকে সিডনির অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়, তখন সেখানে বিক্ষোভ দেখা যায়। ইরানি-অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রদায়ের অনেকেই রাস্তায় নেমে নারীদের ইরানে ফেরত পাঠানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

এই সংকটের সূচনা হয় যখন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দলটিকে “বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যা দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, এশিয়ান কাপের প্রথম ম্যাচের আগে তারা জাতীয় সংগীত গায়নি। যদিও পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দলটি জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেছে।

তবে ইরান (Iran)-এর প্রধান কৌঁসুলির দপ্তর মঙ্গলবার দলের বাকি সদস্যদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির তাসনিম বার্তা সংস্থার বরাতে জানানো হয়, “এই প্রিয়জনদের শান্তি ও আস্থার সঙ্গে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে এসে পরিবারের উদ্বেগ দূর করতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।”

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই (Esmail Baghaei) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “ইরানের নারী ফুটবল দলের প্রতি—চিন্তা করো না। ইরান উন্মুক্ত বাহু নিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

এই ঘটনা ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে রয়েছে ইরান। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলছিল ওই ফুটবল টুর্নামেন্ট। চলমান সংঘাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei) এবং বহু শীর্ষ কর্মকর্তার নি’\হত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধের ১২তম দিনে পৌঁছে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,২৫৫ জন নি’\হত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

এদিকে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাটির মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া সরকার একটি নতুন আইন আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যেসব দেশের নাগরিক ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন, তাদের প্রবেশ সাময়িকভাবে সীমিত করা যেতে পারে। এমনকি বৈধ অস্থায়ী ভিসা থাকলেও ছয় মাস পর্যন্ত প্রবেশ স্থগিত রাখার ক্ষমতা রাখা হতে পারে এই আইনে।

এই প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সমালোচনা করেছে অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনস পার্টি (Australian Greens)। দলটির সিনেটর ডেভিড শুব্রিজ বলেন, এই আইন মূলত ইরান, লেবানন ও কাতারের মতো দেশের মানুষের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয়ের পথ বন্ধ করতে পারে।

অন্যদিকে আশ্রয়প্রার্থী সম্পদ কেন্দ্রের প্রধান কোন কারাপানাগিওটিডিসও সমালোচনা করে বলেন, “অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান চালিয়ে মানুষের মুক্তির কথা বলছে, আবার একই সময়ে সেই মানুষদের জন্য দরজা বন্ধ করার আইন আনছে—যাদের সুরক্ষা এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *