বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতার মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান আরও অবনতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (Reporters Without Borders – RSF) বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ২০২৬ সালের সূচক প্রকাশ করলে দেখা যায়, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নেমে গেছে ১৫২তম স্থানে। গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। শুধু অবস্থানই নয়, প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে এবার দেশটিকে ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতির তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরএসএফ পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ সূচকে। রাজনৈতিক চাপ, গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি এবং ভিন্নমত সহ্য করার সংস্কৃতির অভাব—এই তিনটি বিষয় সম্মিলিতভাবে স্কোরে বড় ধরনের পতন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে গণমাধ্যমের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টিও নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
তবে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে কিছুটা ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। বাংলাদেশ (Bangladesh) এখনও পাকিস্তান (Pakistan)-এর চেয়ে এক ধাপ এবং ভারত (India)-এর চেয়ে পাঁচ ধাপ এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই অবস্থান অনেকটাই পিছিয়ে। নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে ৬৫ ধাপ এগিয়ে, শ্রীলঙ্কা ১৮ ধাপ এবং ভুটান ২ ধাপ এগিয়ে অবস্থান করছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। আরএসএফের ২৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বৈশ্বিক গড় স্কোর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। ২০০২ সালে যেখানে বিশ্বের ২০ শতাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করত যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ভালো’ ছিল, ২০২৬ সালে তা কমে ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ বছর মাত্র সাতটি দেশ ‘ভালো’ ক্যাটাগরিতে জায়গা পেয়েছে, যেখানে নরওয়ে (Norway) টানা দশ বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বিপরীতে, ইরিত্রিয়া টানা তিন বছর ধরে তালিকার একেবারে নিচে অবস্থান করছে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনও এই সূচকে প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ‘মোটামুটি ভালো’ থেকে ‘সমস্যাপূর্ণ’ পর্যায়ে নেমে আসে, এবং এ বছর আরও সাত ধাপ পিছিয়ে ৬৪তম স্থানে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া (Russia) ১৭২তম অবস্থানে রয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা বিরোধী আইন ব্যবহার করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে ৪৮ জন সাংবাদিক কারাবন্দী রয়েছেন বলে জানিয়েছে আরএসএফ।
তবে কিছু দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের শেষে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার অবস্থানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশটি ৩৬ ধাপ এগিয়ে এখন ১৪১তম স্থানে রয়েছে।
আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক আন বোকান্দে এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে এবং অপরাধীরা দায়মুক্তি পাচ্ছে—যা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় হুমকি।


