২০২৪ সালের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ (Bangladesh)-এর রাজনৈতিক পটভূমিতে বড় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় দিবসের তালিকাতেও এসেছে নতুন বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনের তালিকা প্রণয়ন করেছিল, তা অপরিবর্তিত রেখেছে তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party) সরকার। ফলে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ও ১৫ আগস্টসহ আগেই বাতিল হওয়া আটটি জাতীয় দিবস নতুন তালিকায় আর ফিরে আসেনি।
বুধবার (১১ মার্চ) জারি করা এক সরকারি পরিপত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে উদযাপন ও পালনের জন্য মোট ৮৯টি দিবসের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে ১৭টি দিবস, ‘খ’ শ্রেণিতে ৩৭টি এবং ‘গ’ শ্রেণিতে ৩৫টি দিবস।
নতুন পরিপত্রেও ‘ক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে ৫ আগস্টকে, যেদিন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দিনটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় রংপুর (Rangpur)-এ পুলিশের গু’\লিতে ছাত্র আবু সাঈদ (Abu Sayeed) নি’\হত হওয়ার দিন ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্তও বহাল রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই নিয়েছিল, যা বর্তমান সরকারও অপরিবর্তিত রেখেছে।
পরিপত্র অনুযায়ী আগের মতোই দিবসগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিতে থাকা জাতীয় পর্যায়ের ১৭টি দিবস বা উৎসব যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হবে। এসব দিবসে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকতা ও কর্মসূচি পালিত হবে।
‘খ’ শ্রেণির ৩৭টি দিবসের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যেসব দিবস ঐতিহ্যগতভাবে পালন করা হয়ে থাকে অথবা দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণে সহায়ক—সেসব দিবস উল্লেখযোগ্য পরিসরে পালন করা যেতে পারে। এসব অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সম্পৃক্ত থাকবেন এবং গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য সরকারি উৎস থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ‘গ’ শ্রেণিতে থাকা ৩৫টি দিবসকে প্রতীকীভাবে সীমিত পরিসরে পালনের কথা বলা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকবেন কি না, তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হবে। উন্নয়ন খাত থেকে এসব দিবস পালনের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়নি।
পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, এই তিন শ্রেণির বাইরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের উদ্যোগে আরও কিছু দিবস নিয়মিতভাবে পালন করা হয়ে থাকে। তবে এদের অনেকগুলোই গতানুগতিক এবং কখনও কখনও পুনরাবৃত্তিমূলক, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সময় ও সম্পদ সাশ্রয়ের স্বার্থে সরকারি সংস্থাগুলোকে এসব দিবস পালনে সম্পৃক্ততা পরিহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা সপ্তাহ, প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ, বিজ্ঞান সপ্তাহ, বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (১–৭ আগস্ট), বিশ্ব শিশু সপ্তাহ (২৯ সেপ্টেম্বর–৫ অক্টোবর), জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ (নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ), সশস্ত্র বাহিনী দিবস (২১ নভেম্বর), পুলিশ সপ্তাহ, বিজিবি সপ্তাহ, আনসার সপ্তাহ, মৎস্য পক্ষ, বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং জাতীয় ক্রীড়া সপ্তাহ পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মসূচি নিতে বলা হয়েছে। অনুমোদিত কর্মসূচি অনুসারেই এসব আয়োজন করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ের উৎসব ছাড়াও সাধারণভাবে দিবস পালনের ক্ষেত্রে পরিপত্রে কিছু সংযমী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জা ও বড় ধরনের বিচিত্রানুষ্ঠান যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। তবে বেতার ও টেলিভিশনে আলোচনা অনুষ্ঠান, সীমিত পরিসরে সেমিনার বা সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা যেতে পারে। কর্মদিবসে সমাবেশ বা শোভাযাত্রা আয়োজন না করার নির্দেশনাও রয়েছে।
কোনো সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানসূচি সাধারণত তিন দিনের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে যেন সরকারি কর্মসূচির কারণে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আলোচনা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্ভব হলে ছুটির দিনে বা অফিস সময়ের পর আয়োজন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নগদ অর্থ বা উপকরণ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়—এমন সাধারণ অনুষ্ঠানগুলো ছুটির দিন কিংবা কার্যদিবসে আয়োজন করা যেতে পারে। যেমন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী প্রচার, প্রয়োজনে পতাকা উত্তোলন, ঘরোয়া আলোচনা সভা, রেডিও ও টেলিভিশনে আলোচনা অনুষ্ঠান এবং পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ইত্যাদি।
এছাড়া কোনো দিবস বা সপ্তাহ পালন উপলক্ষে রাজধানীর বাইরে থেকে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢাকায় আনা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তাদের অধিক্ষেত্রে সমধর্মী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক দিবসকে প্রাধান্য দিয়ে একই তারিখে একত্রে উদযাপনের কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে।


