ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে দেওয়া তার ভাষণে উঠে আসে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার নানা দিক।
ভাষণের শুরুতেই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)। একই সঙ্গে তিনি বারবার উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার ছিল ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং তাদের শাসনামলে বাংলাদেশ ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির ভাষণে দাবি করা হয়, পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে সেই কলঙ্ক থেকে দেশ মুক্তি পায়।
ভাষণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ। রাষ্ট্রপতি শেষে তার বক্তব্য শেষ করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammad Shahabuddin) সাধারণত তার বক্তব্য শেষ করতেন ‘জয় বাংলা’ বলে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও তিনি ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করেননি।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করলেও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর গত ৬ মার্চ প্রথমবারের মতো সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে দেওয়া সেই বক্তব্যও তিনি শেষ করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে—যা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission)-এর কমিশনার ছিলেন। সে সময় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘সাহাবুদ্দিন চুপপু’ নামেই পরিচিত ছিলেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। এমনকি সংসদে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ভিত্তিতেই প্রস্তুত হয় এবং সেখানে মূলত সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনার কথাই তুলে ধরা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে বিরোধী আসনে থাকা জামায়াত জোটের সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। তারা লাল রঙের প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা স্লোগান প্রদর্শন করেন।
সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত নিয়মে সংসদ নেতা ও সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।
বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir)সহ সংসদের কর্মকর্তারা সবাইকে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসেই ছিলেন। তবে জাতীয় সংগীতের সময় জামায়াত জোটের সদস্যদের প্রতিবাদ থামিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করলে বিরোধী সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন এবং কিছু সময় পর স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো শহিদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।”
তিনি নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ভোটারদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে এবং সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলও রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানান। তখন সরকারদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে বক্তব্যকে স্বাগত জানান।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব নেতার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। একই সঙ্গে তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-র অবদানও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং বলেন, তিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খু’\ন এবং বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্রের নতুন পথের সূচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন এবং বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রপতি জানান, ফ্যাসিবাদ পতনের পর রাষ্ট্র মেরামতের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
ইশতেহারে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দুর্নীতির সূচক নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে বিএনপির ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালের জুনে ক্ষমতা ছাড়ার সময় বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন অবস্থায় রেখে যায়। পরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন প্রণয়ন করে।
তার ভাষায়, এর ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায় এবং ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগেই বাংলাদেশ এশিয়ার ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এবারও দুর্নীতি দমন ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে বর্তমান সরকারের প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।


